
মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরা কিশোর মুক্তিযোদ্ধার গল্প
রুদ্র রুহান১৯৭১ সাল। দেশ জুড়ে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালিদের নির্বিচারে হত্যা ও ধংসযজ্ঞ চালাচ্ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সে সময় মাতৃভূমি আর দেশবাসীকে বাঁচাতে শক্তিশালী পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন অসীম সাহসী বাঙালিরা। এমনকি অনেক কিশোরও যুদ্ধে নেমেছিলেন। তেমনই এক কিশোর ছিলেন বরগুনার ফারুকুল ইসলাম।
একাত্তরের মে মাসে এক অভিযানের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে ধরা পড়েছিলেন ফারুকুল ইসলাম। মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফেরেন তিনি। রাইজিংবিডির এই প্রতিবেদককে সে গল্প শুনিয়েছেন ফারুকুল ইসলাম।
পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে মোশারেফ হোসেন সানু, নাসির উদ্দিন এবং ফারুকুল ইসলাম ছিলেন পিঠাপিঠি। প্রতি রাতেই লেখাপড়া শেষে ছোট দুই ভাই নাসির এবং ফারুকুলকে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট বোঝাতেন মোশারেফ হোসেন সানু। সেজো ভাই সানু বিয়ে করেছেন মাস তিনেক হয়েছে। নাসির তখন মেট্রিক পরীক্ষার্থী। আর কিশোর ফারুকুল তখন পড়তেন ক্লাস নাইনে। একপর্যায়ে তারা তিনজনেই বরগুনার ওয়্যারলেস স্টেশন গুঁড়িয়ে দেয়ার শপথ নেন। দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য তিন ভাই পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছেন ফারুকুল। কিন্ত নাসির ও সানুর আর ফেরা হয়নি।
ফারুকুল ইসলাম বলেন, ‘একদিন সানু ভাই ডেকে বলল, বরগুনার ওয়্যারলেস স্টেশন থেকে রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের সকল তথ্য পাঠায় পটুয়াখালীর হানাদার ক্যাম্পে। তাই ওই ওয়্যারলেস অফিসটিই আগে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। যেমন পরিকল্পনা তেমন কাজ- তিন ভাই মিলে পাক হানাদারদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য বরগুনার ওয়্যারলেস স্টেশন গুঁড়িয়ে দিতে গিয়েছিলাম তিন ভাই। কিন্ত অফিসের কাছে গিয়ে ফিরে আসলাম। অফিস গুঁড়িয়ে দেয়ার মতো কিছু নেই আমাদের কাছে। একবার ভাবলাম, ওয়্যারলেস মেশিনটি পুড়িয়ে দিতে হবে। আবারও অভিযান চালাতে হবে। ’
তিনি জানান, ২১ মে, সকাল ৮টা। ফারুকুল, তার দুই ভাই, অহিদুল ইসলাম পান্না, গিয়াস উদ্দিনসহ আরো কয়েকজন অভিযান চালান ওয়্যারলেস অফিসে। অপারেটর মফিজের কাছে চাবি চাইলে তিনি কিছুতেই তা দিতে চাচ্ছিলেন না। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে সেখানে লুকিয়ে থাকা তৎকালীন ওসি আনোয়ার হোসেন ও তার দল ফারুকুলদের ঘিরে ফেলে। অন্য সবাই পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও ধরা পড়েন ফারুকুল ও তার দুই ভাই। তাদের আটক করে নেয়া হয় বরগুনা জেলখানায়। সেখানে তিন ভাইয়ের পায়ে লোহার বেড়ি পরিয়ে দেয়া হয়। ২৮ মে পটুয়াখালী থেকে ১০০ পাকিস্তানি সৈন্য আসে বরগুনায়। ২৯ মে সকাল ১০টায় ওসি আনোয়ারসহ জেলাখানায় আসেন মেজর নাদের পারভেজ। তিন ভাইকে দেখিয়ে তাদের আটকের কারণ ব্যাখ্যা করেন ওসি আনোয়ার। এ সময় ফারুকুলের ভাই সানু মেজর নাদের পারভেজের সঙ্গে দুই-তিন মিনিট উর্দুতে কথা বলেন। এরপরেই মেজর নাদের পারভেজ নাসির এবং ফারুকুলকে গুলি করার নির্দেশ দিয়ে বড় ভাই সানুকে ধরে নিয়ে বাইরে চলে যান।
তারপর বিভিন্ন সময় আটক করা অর্ধশত মানুষকে জড়ো করে ২৯ মে সকাল ৯টা থেকে শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ৩৮ জনকে হত্যা করে ওরা। সবশেষে নিয়ে যাওয়া হয় দুই ভাই নাসির এবং ফারুকুলকে। তাদের দুজনকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়া হয় লাশের স্তূপের ওপর। তার পরেই গুলি। গুলি খেয়ে পড়ে গেলেন দুজনেই। ফারুকুলের পিঠ ছিঁলে যায় বুলেটের আঘাতে। তবে বুলেট তার শরীর ভেদ করেনি। কিছুক্ষণ সংজ্ঞাহীন থাকার পর কিশোর ফারুকুল বুঝলেন, তিনি বেঁচে আছেন। তবুও মরার মতো পড়ে থাকলেন। তার পিঠের ওপর দাঁড়িয়ে সব লাশের ওপর বেয়নেট চার্জ করতে থাকল ওরা। উদ্দেশ্য- যাতে গুলি খেয়েও কেউ বেঁচে না যায়, তা নিশ্চিত হওয়া। একসময় সবার মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে যায় হানাদাররা।
চার-পাঁচ মিনিট কেটে যাওয়ার পর একটু নড়াচড়া অনুভব করলেন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ফারুকুল। দেখলেন, সহোদর নাসিরকে। ভাই নাসির ফারুকুলের পায়ের বেড়ি ধরে টানছেন আর বলছেন, ফারুক, তুই কি বেঁচে আছিস? তড়িঘড়ি করে উঠে বসে ফারুকুল বললেন, ‘হ্যাঁ দাদা, আমি বেঁচে আছি। আমার গায়ে কোনো গুলি ঢোকেনি।’ এরপর দেখলেন বুলেটের আঘাতে নাসিরের পেটের নাড়িভুড়ি বেরিয়ে এসেছে বাইরে। ফারুকুল তা পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে চেপে ধরে রাখার চেষ্টা করলেন। ফারুকুলের দুই গালে দুটো চুমু দিলেন ভাই নাসির। বললেন, ‘কোনো লাভ নেই। আমি বাঁচব না। দোয়া করি, আল্লাহ যেন তোকে বাঁচিয়ে রাখেন। তুই যদি বেঁচে যাস, মাকে দেখে রাখিস।’ এরপরেই সে বলল, ‘আমাকে একটু পানি দে ভাই।’ কিশোর ফারুকুল বললেন, ‘পানি পাব কোথায়, চারিদিকে শুধু রক্ত আর রক্ত!’ মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা সহোদর নাসির আবারও বললেন, ‘ফারুক, মরার সময় একটু পানিও পাব না!’
এরপর আর কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না নাসিরের মুখ দিয়ে। শুধু বিড়বিড় করে কী যেন বলছিল। চোখের সামনে একসময় নিথর হয়ে গেল নাসির। এরপর ভাই নাসিরের দুই চোখ বন্ধ করে দিলেন ফারুকুল। এরপর তার মনে পড়ল অপর সহোদর সানুর কথা। মেজর নাদের পারভেজ তাকে নিয়ে গেছে। কোনো বধ্যভূমিতে তার মৃত্যু হয়েছে তা কে জানে। নিশ্চয়ই মৃত্যুর সময় তাকেও পানি দেয়নি কেউ।
এভাবে ভাবতে ভাবতে যখন আবারও জ্ঞান হারাতে যাচ্ছিলেন তখন, মৃত্যুর স্তূপে আবারও একটু নড়াচড়া অনুভব করলেন ফারুকুল। দেখলেন বয়স্ক একজন উঠে বসেছেন। চোয়ালের এক পাশে গুলি লেগে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। বিভৎস মুখমণ্ডল নিয়ে উঠে বসেছেন। কিশোর ফারুকুলকে বসা দেখে উদভ্রান্তের মতো বলতে থাকলেন, ‘আমি বেঁচে আছি, বাবা। আমি বাঁচব।’
মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে বৃদ্ধের সে কি আকুতি! চেহারায় নয়, কণ্ঠ শুনে কিশোর ফারুকুল তাকে চিনতে পারলেন। তিনি বরগুনার সবার পরিচিত কেষ্ট ডাক্তার। ফারুকুল বললেন, ‘কোনো নড়াচড়া না করে মৃতের মতো পড়ে থাকেন। আপনার পায়ে বেড়ি নেই। তাই আপনার বাঁচার সুযোগ আছে। সব লাশের সঙ্গে আপনাকেও নিয়ে যখন মাটিচাপা দিতে যাবে তখন পালানোর চেষ্টা করবেন।’ বুলেটের যন্ত্রণায় ছটফট করা সে বৃদ্ধ ফারুকুলের কথা শুনেছিলেন। তবুও তার শেষরক্ষা হয়নি। পরে জানা গেছে, মাটিচাপা দেয়ার সময় তিনি লাশের স্তূপ থেকে দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করেছিলেন। রাজাকাররা তখন তাকে কোদাল দিয়ে নৃসংশভাবে পিটিয়ে মেরেছিল।
মিনিট বিশেক পরে আবারও পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। স্থানীয় দুজন রাজাকার এল। ফারুকুল তাদের চেনেন। তার সঙ্গে তাদের বিশেষ কোনো শত্রুতা ছিল না। তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেন ফারুকুল। তবুও তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘ভাই, আমি মরিনি। আমাকে বাঁচান।’ তারা বলল, ‘দ্যাখ, আমাদের কিছুই করার নেই। তোর বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। তারা যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তাই হবে।’
ওই দুই রাজাকার চলে যাওয়ার মুহূর্তের মধ্যেই ফারুকুলের চারপাশে ৪০/৫০ জন পাকিস্তানি সৈন্য ছুটে এসে তার দিকে অস্ত্র তাক করে রাখল। একটু পরেই এল জল্লাদ ইকবাল। ইশারায় সবাইকে অস্ত্র সরিয়ে নিতে বলল। ওরা তাকে উঠিয়ে ক্যাপ্টেনের কাছে নিয়ে গেল।
ক্যাপ্টেন জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কাছে কোনো তাবিজ/কবচ আছে কি না?’ ফারুকুল উর্দু ভালো বুঝতেন না। তবুও অনুমানে তিনি বুঝতে পারলেন। উত্তর দিলেন, ‘না’। এরপর তাকে চেক করা হল। কিছুই পেল না ওরা। ফারুকুলের সারা শরীর রক্তমাখা ছিল। পাকিস্তানি হানাদারারা তাকে গোসল করতে বললেন। গোসল করলেন ফারুকুল। তাকে স্টিলের একটি মগে এক কাপ গরম চা খেতে দেয়া হল। দেয়া হলো এক প্যাকেট সিগারেট। চা-সিগারেটের অভ্যাস ছিল না তার। তারপরও তাকে তা খেতে বাধ্য করা হল। এরপর তাকে অন্য একটি কক্ষে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
৩০ মে। এক এক করে আরো ১৭ জনকে গুলি করে হত্যা করল হানাদাররা। ফারুকুলের কক্ষের দরজা খুলল। তাকে টানাহেঁচড়া করে মৃত্যুপুরীর দিকে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। ফারুকুল জানালেন, ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা বলতে চান তিনি। কিন্তু ওরা তার কথা শুনল না। সবাইকে ধাক্কা মেরে ছুটলেন ফারুকুল। ক্যাপ্টেন দূর থেকে তা দেখল। ফারুকুল চিৎকার করে বললেন, ‘আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই, স্যার’। এরপর আকস্মিকভাবে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন ফারুকুল। তাকে ডাক্তার দেখানো হল। ডাক্তাররা তার অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানালেন।
এদিকে, তিন সন্তানকে হারিয়ে ফারুকুলের মা অমেরুননেছা বরগুনার তৎকালীন এসডিও আনোয়ার সাহেবের সঙ্গে দেখা করে ফারুকুলের মুক্তির জন্য হাতেপায়ে ধরলেন। এতে এসডিও সাহেবের দয়া হলো। তিনি ফারুকুলের মায়ের অবস্থা দেখে পটুয়াখালীতে মেজর নাদের পারভেজের কাছে তার মুক্তির জন্য অনুরোধ জানালেন। এসডিও সাহেবের চেষ্টায় একসময় মুক্তি পান কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ফারুকুল। মুক্তি পেয়ে অনেকদিন অসুস্থ ছিলেন তিনি। এ অবস্থায় পুনরায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বিভিন্ন অপারেশনে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও যেতে পারেননি তিনি।
এর বেশকিছু দিন পর মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযানে একসময় আত্মসমর্পণ করে বরগুনার রাজাকাররা। সর্বশেষ অপারেশনে বরগুনার আমতলী থানায় যুদ্ধ করতে করতে ধরা পড়েন ওসি আনোয়ার। সে সময় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জুলফিকার লোক পাঠিয়ে ডেকে নেন ফারুকুলকে। ‘ফারুক, তোমার ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নাও,’ বলেন কমান্ডার জুলফিকার। ওসি আনোয়ারসহ রাজাকার মোতালেব মাস্টার, হোসেন মাস্টার এবং কাওসারকে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম বরগুনার খাকদোন নদীর তীরে। ওসি আনোয়ারের পেটে আঘাতের পর আঘাত করতে থাকেন ফারুকুল। আনোয়ার পানি পানি বলে চিৎকার করলে ফারুকুল বলেন, ‘আনোয়ার! ওই দ্যাখ, দুই হাত দুরেই খাকদোন নদী। অনেক পানি সেখানে। কিন্তু তা তোর মতো বেইমানের জন্য নয়।’ এরপর লাথি দিয়ে তার দাঁত ভেঙে দেন ফারুকুল। মৃত্যু হয় ওসি আনোয়ারের।
ফারুকুল ইসলাম বলেন, মুক্তির যে মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে দেশের জন্য জীবন বিপন্ন করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম যুদ্ধে, সেই দেশ কোথায়? এই দেশ তো চাইনি আমরা। এই স্বাধীন দেশে এখন বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। এত ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার, এত মৃত্যু আর ধংসযজ্ঞ চলে এখানে। আমি ব্যথিত হই।’ বলতে বলতে চুপ হয়ে যান ফারুকুল ইসলাম।
হঠাৎ বিড়বিড় করে তিনি বলেন, আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই/আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি/ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে…।’
-একটু চা খাবেন?
-জ্বি।
উঠে দাঁড়াই দুজনে। শহরের সাহা পট্টির সড়কের ওপারে চায়ের দোকানের দিকে হেঁটে যাই আমরা।
বরগুনা/রুদ্র রুহান/রফিক
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/2Q5HJkW
0 comments:
Post a Comment