
যেভাবে শূন্য থেকে শীর্ষে বিদর্ভ
নাগপুর থেকে ক্রীড়া প্রতিবেদক‘মানুষ একটা সময় জানত না বিদর্ভটা কোথায়। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আলাদা। বিদর্ভের জন্য এটা অনেক বড় ব্যাপার। দল দারুণ কাজ করেছে। আমি কখনও ভাবিনি আমি বিদর্ভের হয়ে দুটো টাইটেল জিততে পারব।’ – পরপর দুবার ভারতের সবথেকে মর্যাদাপূর্ণ রঞ্জি ট্রফি জয়ের পর কথাগুলো বলছিলেন উমেশ যাদব।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শত ব্যস্ততার ভেতরেও নিজের ঘরের দল বিদর্ভের হয়ে প্রথম শ্রেণির খেলা চালিয়েছেন উমেশ। ২০১৮ সালে গৌতম গাম্ভীরের দিল্লিকে এবং ২০১৯ সালে সৌরাষ্ট্র ক্রিকেট দলকে হারিয়ে পরপর দুবার রঞ্জির শিরোপা ঘরে তুলে বিদর্ভ। শুধু রঞ্জিই নয়, পরপর দুই মৌসুমে ইরানি কাপও জিতেছে তারা। সাফল্যের উচ্চ শিখরে পৌঁছার পেছনে অক্লান্ত পরিশ্রম আর দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা করেছে বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েসন। শেষ দুই বছরে চমক দেখিয়েছে বিদর্ভ।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনান্দ জয়াসওয়াল নিজেদের কষ্ট ও সাফল্যর গল্প শুনিয়েছেন রাইজিংবিডিকে।
‘২০০৮-০৯ মৌসুমে আমাদের রেসিডেন্সিয়াল একাডেমি ছিল। সেখান থেকে আমরা আজ রঞ্জির সেরা দল। এ সাফল্যের পেছনে সবথেকে বড় অবদান আইসিসির চেয়ারম্যান শশাঙ্ক মনোহরের। আমাদের প্রথম শর্তই ছিল, আমরা আমাদের ঘরের ছেলেদের সেরা সুযোগ-সুবিধা দেব এবং তাদের থেকে সেরা ক্রিকেটটা বের করে আনব। দীর্ঘ পরিকল্পনা, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণেই আজ আমরা এখানে।’
‘শেষ দুই মৌসুমে আমরা দুটি রঞ্জি শিরোপা, দুটি ইরানি ট্রফি জিতেছি। এছাড়া আমরা বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট যেমন অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-১৬ ক্রিকেট জিতেছি। আমরা এ সময়টায় একাধিক শিরোপা পেয়েছি। কারণ, আমরা জানতাম একটা সময় পর সাফল্য আমাদের কাছে এসে ধরা দেবে। ওদের পেছনে বিনিয়োগ করার কারণেই আমরা ফল পাচ্ছি।’
বিদর্ভের সাফল্যের পেছনে দুজনের অবদান কখনোই ভোলা সম্ভব নয়। প্রথমজন- দলটির প্রাক্তন অধিনায়ক ওয়াসিম জাফর। দ্বিতীয়জন- কোচ চন্দ্রকান্ত পণ্ডিত। ওয়াসিম জাফর মাঠের ভেতরে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন দারুণভাবে। আর কোচ চন্দ্রকান্ত পণ্ডিত খেলোয়াড়দের বিশ্বাস করাতে শুরু করেন তাদের ভেতরে রয়েছে বিশেষ কিছু। ছেলেদের ক্রিকেট মানসিকতা পাল্টে দেন পণ্ডিত।
‘দেখুন আগে যেটা হতো, বড় রাজ্যের দলগুলো শিরোপা জিতত। কিন্তু পণ্ডিত খেলোয়াড়দের বিশ্বাস করাতে শুরু করেন, ‘‘তোমরা অপ্রতিরোধ্য। তোমরা ওই দলগুলোর মতোই শক্তিশালী। ’’ ওর উৎসাহে ছেলেরা পেয়ে যায় ফাইটিং স্পিরিট। ওখান থেকেই ছেলেরা ম্যাচ জয়ের প্রেরণা পেয়ে যায়। ধাপে ধাপে আমরা এগিয়ে যেতে থাকি। এভাবেই আমাদের সাফল্য আসতে থাকে।’
ছেলেদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আনান্দ বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্যই ছিল খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়া। একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার যে সুবিধা পাবে বিদর্ভের ক্রিকেটাররাও সেই সুবিধা পাবে। এখানে ভারত দল যা সুবিধা পাচ্ছে আমাদের ক্রিকেটাররাও সেই সুবিধা পেয়ে থাকে। মাঠ সব সময়ের জন্য উন্মুক্ত। মাঠের পাশেই একাডেমি এবং ইনডোর। সাপোর্ট স্টাফ সব সময় পাওয়া যায়। আমি ছেলেদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমাদের কাজটা পেপার ওয়ার্কের উপরই নির্ভরশীল। মূল কাজটা ওদেরই।’
সারাবছর খেলোয়াড় বাছাই করে থাকে বিদর্ভ। খেলোয়াড় বাছাইয়ের জন্য নিজেদের রাজ্যে নিয়োগ করা রয়েছে একাধিক নির্বাচক। চলে ট্যালেন্ট হান্ট প্রোগ্রাম। সবকিছুতেই নির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী পথ চলা বিদর্ভের। তাতেই মিলেছে সাফল্য। খেলোয়াড়দের উদ্ধুদ্ধ করার জন্য নিজেদের খরচে অ্যাওয়ার্ড নাইট করে থাকে বিদর্ভ। শেষ তিন বছর এ প্রোগ্রাম করছে অ্যাসোসিয়েনটি। আর্থিক পুরস্কারের পাশাপাশি দেওয়া হয় খেলার সরঞ্জাম।
‘আমরা সব সময় ওদের অনুপ্রাণিত করি। ধরুণ, অনূর্ধ্ব-১৯ কিংবা ২৩ দলকে আমরা আর্থিক পুরস্কার দিই। এছাড়া তাদের নিচের খেলোয়াড়দের খেলার সরঞ্জাম দেওয়া হয়। বছরের সেরা খেলোয়াড়কে আলাদা করে পুরস্কৃত করা হয়। ’
ওয়াসিম জাফর ভারতের হয়ে টেস্ট খেলেছেন। উমেশ যাদব বর্তমানে টেস্টের সেরা পেসারদের একজন। এছাড়া ইন্ডিয়া ‘এ’ এবং ইমার্জিং কাপে খেলছেন বিদর্ভের একাধিক খেলোয়াড়। আনান্দের বিশ্বাস শীঘ্রই তাদের আরও কয়েকজন খেলোয়াড় বিসিসিআিইয়ের দলগুলোতে জায়গা পাবেন।
ভারতে একাধিক মাঠ থাকলেও সব সময় রাজ্য সরকারের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েশনের বিরোধ লেগে থাকে। মাঠ পরিচর্যার জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। পানির অপ্রতুলতার কারণে অনেক সময় রাজ্য সরকার পানি সরবরাহ করতে পারে না। কিন্তু বিদর্ভে পানি নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। মাটির তলদেশ থেকে তারা পানির সরবরাহ পায়। তা দিয়েই মাঠ পরিচালনা করতে পারে অ্যাসোসিয়েশন।
এছাড়া নিজেদের উদ্যোগে সোলার সাপ্লাই করেছে বিদর্ভ। তাতে বিদ্যুতের সমস্যাও অনেকটা দূর হয়। শহরের বাইরে খোলামেলা পরিবেশে গড়ে উঠেছে বিদর্ভ ক্রিকেট স্টেডিয়াম। চারপাশ সবুজ আচ্ছাদনে ঘেরা। ভারতের এ মাঠটি দৈর্ঘ্যে সবথেকে বড়। ৪৫ হাজার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন স্টেডিয়ামটি ২০০৮ সালে গড়ে উঠে। এরপর নিয়মিতই খেলা হচ্ছে এখানে।
বড় কোনো তারকা নেই। অধিনায়কের নাম ফাইয়াজ ফজল। তার সাথে আছেন একঝাঁক তরুণ ও উদ্দ্যমী ক্রিকেটার। মাঠের চাকচিক্য, অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধা আর বিদর্ভের পরিকল্পনা বলে দেয় কেন তারা বর্তমানের রঞ্জি চ্যাম্পিয়ন। কেন তারা চমক দেখানো বিদর্ভ।
নাগপুর/ইয়াসিন/আমিনুল
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/2Cqxcul
0 comments:
Post a Comment