
যুদ্ধে হারিয়েছেন চোখ, তবু অন্ধকারের আলোবর্তিকা হরিদা
রুদ্র রুহানএকাত্তরের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ভাষণ শোনার পর কারোই বুঝতে বাকি ছিল না, বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে। যে যার মতো করে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে সেদিন থেকেই। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার পর তার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। "তখনই নিশ্চিত মৃত্যু মেনেই যুদ্ধে যাই।’ কথাগুলো বলছিলেন বরগুনার তালতলী উপজেলার নিভৃত পল্লী চরকগাছিয়ার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা হরিদাস।
তিনি বলেন, "নিশ্চিত মৃত্যু মেনে নিয়েই যুদ্ধে নাম লেখাই। কিন্তু খালি হাত আর লাঠির প্রশিক্ষণে আর যাই হোক অন্তত স্বাধীনতার শিকে ছিড়বে না! তবুও কিছু তো একটা করতেই হবে! সময় হাতে নেই একেবারেই। অস্ত্রের অভাবে বুক পেতে দিয়ে একের পর এক মরছে মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনারা। স্থানীয় বড়ভাই মধুদার দীক্ষা নিয়ে কলেজের কেমেস্ট্রি বিভাগের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মো. আশরাফ হোসেনের নির্দেশনায় দুদিনেই হ্যান্ড গ্রেনেড বানানোর কৌশল শিখে নিলাম। মিলে গেল প্রয়োজনীয় রসদও। ব্যাস! দিনরাত নির্ঘুম চলতে থাকে কাজ। সহপাঠী চিত্তরঞ্জন মিস্ত্রিসহ আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে অতি সন্তর্পণে চলে নিজস্ব পদ্ধতিতে হ্যান্ড গ্রেনেড উৎপাদন। এগিয়ে চলে মুক্তিযুদ্ধ।
আবার প্রায় পাঁচ দশক আগের সেসব দিনে ফিরে গিয়ে বললেন, ‘হঠাৎ একদিন একটি হ্যান্ড গ্রেনেড গড়িয়ে মাটিতে পড়ে গেলে ঘটে বিস্ফোরণ। বাম হাতের সাথে উড়ে যায় ডান চোখও। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরে দেখি, আমি বেঁচে আছি। পাশে গুরুতর আহত হয়ে পড়ে রয়েছেন সহপাঠী চিত্তরঞ্জন মিস্ত্রিও। শরীরটাকে নড়াচড়া করে দেখি উঠে বসার সামর্থ জোগান দিচ্ছে। বসলাম, পাশেই চিত্তদা কাতরাচ্ছে ব্যাথায়। বোমার শব্দ বাতাসে ভর করে আশপাশে অবস্থান রাজাকার বিচ্ছুদের কান গলিয়ে এসব খবর ছড়িয়ে পড়ে হানাদার ক্যাম্পেও। ‘
তারপর আহত অবস্থাতেই আত্মগোপনের কথা আসে মুক্তিযোদ্ধার হরিদা মুখে, বলেন, ‘ক্ষত-বিক্ষত-রক্তাক্ত শরীর নিয়ে এ বাড়ি ও বাড়ি আর বনে বাদারে ধুকে ধুকে চলে জীবন। স্থানীয় একটি বাড়িতে আশ্রয় চেয়ে নেই। আশ্রয় হয়, কোনোমতে রাত কাটাই সে বাড়িতে। খুব ভোরে উঠে আবার বন বাঁদার ঘুরে পথ চলা শুর হয়। চিত্ত দা’কে নিয়ে চলতে পারছিলাম না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। পথ চলছিলাম. হঠাতই নিথর হয়ে পড়ে চিত্তরঞ্জন মিস্ত্রির আহত শরীর। মরতে মরতেও একসময় প্রাণে বেঁচে যাই আমি। ক্যাম্পে ফিরে সহযোদ্ধাদের সহায়তায় ও চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠলেও ডান হাত ও বাম চোখ হারাতেই হয়। শত্রুমুক্ত হয় দেশ, বুকের ভেতরটায় তখন শৃঙ্খল ভাঙার পরশ, কি হারিয়েছি সে ভাবনাটা আসেনি, দেশকে যদি প্রানটাও দিতে পারতাম ধন্য মনে হত’।
টিনের চালায় আধভাঙা ঘরের উঠোনে জলচৌকিতে বসে হরিদার দৃষ্টি দূরের নীলিমায়। কথাগুলো বলতে বলতে দৃষ্টি ঝাঁপসা হয়ে আসে তার। চোখের কোনায় জমে থাকা জলের এক ফোঁটা ততক্ষণে গাল গড়িয়ে তৃষিত মাটিতে নিমিষেই নিঃশেষ। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাঙ্গেরি পাঠানো হয় হরিদাস অধিকারীকে। সেখানে চিকিৎসার পর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলেও চিরতরে হারাতে হয় তার বাম হাত আর ডান চোখ।
দেশে ফিরে অনেক চাকরির অফার পেলেন বলহরি অধিকারী। কিন্তু না। সকল চাওয়াকে পাওয়াকে পায়ে ঠেলে যুদ্ধ বিদ্ধস্ত বাংলাদেশ গড়তে সত্যিকারের সৎ ও আদর্শবান মানুষ বানানোর ব্রত নিয়ে মহান পেশা শিক্ষকতাকেই বেছে নেন তিনি। তাও আবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বরগুনার তালতলী এলাকার নিজ গ্রাম চরকগাছিয়ার একটি ভাঙ্গাচোরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। সেই থেকে সারাটি জীবন রইলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হয়ে। সহজ সরল সাদামাটা জীবনের সাথে একাত্ম হয়ে জটিল কঠিন এই সমাজে তিনি জ্বলে রইলেন জ্বলজ্বলে উদাহরণ হয়ে।
হরিদাস আজও দিয়েই যাচ্ছেন, তারুণ্যে দেশকে মুক্ত করতে যুদ্ধে গিয়ে হারিয়েছেন শরীরে গুরুত্বর্পূণ অংশ, যুদ্ধ শেষে অন্ধকারাচ্ছন্ন জনপদে জ্বেলেছেন আলোর মশাল, আজও বেঁচে আছেন, সেই তারুণ্যের হরিদা, পরিবার ও স্বজনদের বলহরি। আমাদের স্বাধিনতার বাহক হরি দা।
বরগুনা/রুদ্র রুহান/সাজেদ
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/34VGLNt
0 comments:
Post a Comment