
কেমন হলো বিপিএলের চট্টগ্রাম পর্ব?
আবু হোসেন পরাগ, চট্টগ্রাম থেকেশেষ হয়েছে বিপিএলের চট্টগ্রাম পর্ব। বন্দর নগরীতে ম্যাচ হয়েছে মোট ১২টি। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক কেমন ছিল বিপিএলের এই পর্ব।
বিজয় দিবস উদযাপন
চট্টগ্রামে ব্যাট-বলের লড়াই শুরুর আগের দিন ছিল মহান বিজয় দিবস। সকালে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে রাজশাহী রয়্যালস ও খুলনা টাইগার্স দলের অনুশীলনের সময় অবশ্য বোঝার উপায় ছিল না, দিনটা মহান বিজয় দিবসের। বিষয়টা বোঝা যায় এই দুই দলের পর চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স মাঠে ঢুকতেই।
চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের খেলোয়াড়রা দল বেঁধে মাঠে ঢুকছেন। মাহমুদউল্লাহ, নাসির হোসেনদের মাথায় বিজয় দিবসের ব্যান্ড, হাতে ছোট ছোট পতাকা। চট্টগ্রামের ইংলিশ কোচ পল নিক্সনের মাথায় ব্যান্ড তো ছিলই, তার হাতে বাংলাদেশের ঢাউস এক পতাকাও। পরে তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে বলেন, ‘এটা ৪৯তম বিজয় দিবস উদযাপন।’
‘৩৬০ ডিগ্রি’ মুশফিক
চট্টগ্রামে রান উৎসবের আভাস পাওয়া গিয়েছিল সে ম্যাচেই। আগে ব্যাট করতে নেমে রাজশাহী করেছিল ১৮৯। সেটি কী সহজেই না পেরিয়ে যায় খুলনা টাইগার্স। যার বড় কৃতিত্ব মুশফিকুর রহিমের।আসরের প্রথম সেঞ্চুরিটাও হতে পারত তার ব্যাটেই। কিন্তু জয় থেকে ৩ রান দূরে থাকতে মুশফিক আউট হন ৯৬ রানে। মাত্র ৫১ বলে ৯ চার ও ৪ ছক্কায় ইনিংসটি সাজান খুলনার অধিনায়ক।
মুশফিক সেদিন শট খেলেন উইকেটের চারদিকেই। তাই তো ম্যাচ শেষে খুলনার কোচ জেমস ফস্টার বলে যান, ‘মুশফিক ৩৬০ ডিগ্রি খেলোয়াড়।’ যে তকমা শুধু একজনেরই আছে- এবি ডি ভিলিয়ার্স। দক্ষিণ আফ্রিকান তারকার মতো বাংলাদেশের ‘৩৬০ ডিগ্রি’ হয়ে যান মুশফিক।
ড্রোন নিখোঁজ
চট্টগ্রাম পর্ব শুরুর দিনেই ঘটে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনা। স্টেডিয়াম থেকে হারিয়ে যায় একটি ড্রোন ক্যামেরা! সেদিন শোনা গিয়েছিল, ফ্লাড লাইটের একটি খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বন্ধ হয়ে যায় ড্রোন। এরপর সেটি ছিটকে পড়ে স্টেডিয়ামের বাইরে গিয়ে। পরে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেউ খুঁজে পেলে তাকে পুরস্কৃত করা হবে বলেও ঘোষণা দেওয়া হয় বিপিএল প্রোডাকশনের পক্ষ থেকে।
অবশ্য একদিন পরই পাওয়া যায় ড্রোনটি। আসলে সেটি স্টেডিয়ামের বাইরে ছিটকে পড়েনি। ফ্লাড লাইটের একটি খুঁটিতে আটকে ছিল। পরে সেখান থেকে নামানো হয়।
অবশেষে দুইশ
ঢাকায় আট ম্যাচে হয়নি। দ্বাদশ ম্যাচে চট্টগ্রামে এসে বঙ্গবন্ধু বিপিএল প্রথমবারের মতো দেখে দলীয় দুইশ রান। ঢাকা প্লাটুনের বিপক্ষে লেন্ডল সিমন্স ও মাহমুদউল্লাহর ঝড়ো ফিফটিতে ৪ উইকেটে ২২১ রান তোলে চট্টগ্রাম। তখনো কে জানত, রানের ‘ডাবল সেঞ্চুরি’র দ্বিতীয়টি দেখা যাবে ঘণ্টা দেড়েক পরেই।
মুমিনুল হকের ফিফটির পর থিসারা পেরেরা ও মাশরাফি বিন মুর্তজার ঝড়ো ব্যাটিংয়ে একটা সময় জয়ের সম্ভাবনাও জাগিয়ে তোলে ঢাকা। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ১৬ রানে হেরে যায় তারা, করে ২০৫।
ম্যাচে মোট রান হয় ৪২৬। তখন পর্যন্ত যা বিপিএলের ইতিহাসে কোনো ম্যাচে দুই ইনিংস মিলে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ড। পেছনে পড়ে যায় ২০১৩ সালের আসরে চট্টগ্রামেই দুরন্ত রাজশাহী ও বরিশাল বার্নার্স ম্যাচের ৪২২ রান।
নাসিরের অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড
ঢাকা-চট্টগ্রাম রান উৎসবের ম্যাচে ৪ ওভারে ৬০ রান খরচ করে ফেলেন নাসির হোসেন। যা বিপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে খরুচে বোলিংয়ের রেকর্ড। নাসির ‘মুক্তি’ দেন মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেনকে। গত আসরে চট্টগ্রামেই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের বিপক্ষে ৪ ওভারে ৫৯ রান দিয়েছিলেন খুলনা টাইটানসের হয়ে খেলা পেসার সাদ্দাম।
গতিতে মুগ্ধ করলেন মুকিদুল
বঙ্গবন্ধু বিপিএলে খেলাই হতো না তার। প্লেয়ার্স ড্রাফটে নাম থাকলেও সেখান থেকে দল পাননি মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধ। ১৯ বছর বয়সি পেসার ঢাকা প্লাটুনের নেটে বোলিং করেছেন নিয়মিত। সেখান থেকে সরাসরি সুযোগ পেয়ে যান রংপুর রেঞ্জার্স দলে। তাকে সেই সুযোগটা করে দেন রংপুর রেঞ্জার্সের টিম ডিরেক্টর ও বিসিবির নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন।
চট্টগ্রামে হয় তার বিপিএল অভিষেক। চার ওভারে ২৬ রানে একটি উইকেট পাওয়া মুকিদুল গতির ঝড় তুলে সবার নজর কাড়েন। সেদিন কুমিল্লার বিপক্ষে সর্বোচ্চ ১৩৮ কিলোমিটার গতিতে বল করেন তিনি। পরে তিনি জানান, সর্বোচ্চ ১৪৩ কিলোমিটার গতিতে বোলিংয়ের ঘটনাও আছে তার। বিপিএলে নিজের প্রথম ম্যাচ বলে সেদিন গতির চেয়ে লাইন ও লেংথেই বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন।
রুশোর নাচ
রংপুর রেঞ্জার্সের বিপক্ষে ম্যাচে ফিফটির পর ব্যতিক্রমী এক উদযাপনে সবাইকে বিনোদিত করেন খুলনা টাইগার্সের রাইলি রুশো। ডান হাতে নাক চেপে ধরার মতো করে বাঁ হাত প্রসারিত করেন প্রথমে, এরপর কোমর দুলিয়ে নাচেন কিছুক্ষণ! ম্যাচ শেষে তিনি জানান, ওটা ছিল ভিডিও গেমসের একটি উদযাপন। সতীর্থদের তিনি আগেই বলে রেখেছিলেন, ফিফটি করলে অমন উদযাপন করবেন।
আবার রান বন্যা
টানা দ্বিতীয় ম্যাচে চট্টগ্রাম পেরিয়ে যায় দুইশ। আগে ব্যাট করতে নেমে তোলে ২৩৮ রান। যা বিপিএলের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ। জবাবে কুমিল্লাও কম যায়নি। তারা করে ২২২ রান। ম্যাচে মোট রান হয় ৪৬০। যা বিপিএলের এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ড। পেছনে পড়ে যায় একদিন আগে চট্টগ্রাম-ঢাকা ম্যাচের ৪২৬ রান।
ফুরাল সেঞ্চুরির অপেক্ষা
আসরের প্রথম সেঞ্চুরি দেখতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৫তম ম্যাচ পর্যন্ত। খুলনার বিপক্ষে সিলেটের আন্দ্রে ফ্লেচারের ব্যাট থেকে আসে প্রথম সেঞ্চুরি। যা তার টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারেরও প্রথম সেঞ্চুরি। তার অপরাজিত ১০৩ রানের সুবাদেই আসরে টানা চার হারের পর প্রথম জয়ের স্বাদ পায় সিলেট।
একমত নন মুশফিক
৯৬ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলার পর মুশফিককে ‘৩৬০ ডিগ্রি খেলোয়াড়’ আখ্যা দিয়েছিলেন খুলনার কোচ। এরপর কয়েকদিন সংবাদমাধ্যমের সামনে পাওয়া যায়নি মুশফিককে। যেদিন পাওয়া গেল, সেদিন মুশফিক জানালেন, তিনি নিজেকে ‘৩৬০ ডিগ্রি খেলোয়াড়’ মনে করেন না। তার কথা, ‘দুই ম্যাচও লাগে না ৩৬০ ডিগ্রি থেকে ০ ডিগ্রিতে আসতে! এটা বাংলাদেশ, এটা আমি কখনোই বিশ্বাস করি না। আমি নিজেকে কখনোই এরকম খেলোয়াড় মনে করি না।’
ড্রেসিংরুমে ফিরেও আউট হলেন না ব্যাটসম্যান
ঢাকা-কুমিল্লা ম্যাচ। কুমিল্লার ইনিংসের পঞ্চম ওভারের ঘটনা সেটি। পাকিস্তানি পেসার ওয়াহাব রিয়াজের বলে ক্যাচ দিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যান ভানুকা রাজাপাকসে। মাঠ ছেড়ে তিনি বেরিয়ে গিয়েছিলেন। ফিরেছিলেন ড্রেসিংরুমেও। নতুন ব্যাটসম্যান হিসেবে মাঠে ঢুকে পড়েছিলেন ইয়াসির আলী রাব্বী।
এরপরই টিভি রিপ্লেতে ধরা পড়ে বলটা ছিল পায়ের নো। রাজাপাকসেকে আবার ডেকে পাঠান আম্পায়ার। ঢাকার খেলোয়াড়রা অবশ্য সিদ্ধান্তটা মানতে পারছিলেন না কিছুতেই। মিনিট দুয়েক বন্ধও থাকে খেলা। পরে আবার খেলা শুরু হয়।
নিয়ম অনুযায়ী, আউট দেওয়ার পর পরবর্তী বল হওয়ার আগ পর্যন্ত ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন আম্পায়াররা, যদি তাদের মনে হয় বলটা নো ছিল। কিন্তু ড্রেসিংরুম থেকে কোনো ক্রিকেটার ফিরে এলে সেটা দৃষ্টিকটু লাগে। আম্পায়ারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগ পর্যন্ত আউট হওয়া ক্রিকেটার সাধারণত বাউন্ডারি লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। রাজাপাকসেও দাঁড়িয়ে ছিলেন। ম্যাচ শেষ তিনি জানান, চতুর্থ আম্পায়ার তাকে ড্রেসিংরুমে যেতে বলেছিলেন।
মূল্যহীন মেহেদীর চমক
কুমিল্লার আফগান অফ স্পিনার মুজিব উর রহমানকে সামলাতে তাকে ব্যাটিংয়ে পাঠানো হয় তিন নম্বরে। সেই মেহেদী হাসান ব্যাটিংয়ে নেমেই তোলেন ঝড়। মাত্র ২৯ বলে ২ চার ও ৭ ছক্কায় খেলেন ৫৯ রানের বিস্ফোরক ইনিংস। ম্যাচ শেষে মেহেদী জানান, তার উইকেট নাকি মূল্যহীন, ‘আমি ভ্যালুলেস (মূল্যহীন) উইকেট, মুজিবকে সামলানোর জন্য আমাকে পাঠিয়েছে। আমি অফ স্পিনার পেয়ে গেছি, সুযোগ নিয়েছি এবং সফল হয়েছি।’
মেহেদী আগে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এখন তাকে খেলানো হয় অফ স্পিনার হিসেবে। ব্যাটিং করতে হয় লোয়ার অর্ডারে। নিজের নির্ধারিত কোনো ব্যাটিং পজিশন না থাকায় কুমিল্লার বিপক্ষে ফিফটির পর আক্ষেপও করেছিলেন কিছুটা।
পরদিন সিলেটের বিপক্ষেও তাকে পাঠানো হয় তিন নম্বরে। ঝড় তোলেন এদিনও। আগের ম্যাচে ফিফটি করেন ২২ বলে। এবার ২৩ বলে। আউট হওয়ার আগে ২৮ বলে করেন ৫৬। দুই ম্যাচেই জেতেন ম্যাচ সেরার পুরস্কার। তার উইকেটের মূল্য নিশ্চিতভাবেই এখন বেড়ে যাবে!
দুই হাজারি তামিম
শেষ দিন সিলেটের বিপক্ষে ঢাকার হয়ে ৬০ রানের অপরাজিত ইনিংসের পথে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে বিপিএলে ২ হাজার রানের মাইলফক ছুঁয়েছেন তামিম ইকবাল। ৬২ ইনিংসে তার রান এখন ২ হাজার ২৯। সেঞ্চুরি ১টি, ফিফটি ১৮টি।
চট্টগ্রামেই কদিন আগে তামিমকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন মুশফিকুর রহিম। তামিম এরপর পুনরুদ্ধার করেছেন নিজের জায়গা। ৭২ ইনিংসে মুশফিকের রান ১ হাজার ৯৩৭। নেই কোনো সেঞ্চুরি, ফিফটি ১২টি। ৭৪ ইনিংসে ১ হাজার ৬৯৫ রান নিয়ে তিনে আছেন মাহমুদউল্লাহ।
সেঞ্চুরিতে শেষ
সাগরিকায় শেষ ম্যাচে এসেছে আরেকটি সেঞ্চুরি। রাজশাহীর বিপক্ষে কুমিল্লার হয়ে অপরাজিত ১০০ রান করেন ইংলিশ ব্যাটসম্যান ডেভিড মালান। তবে সেঞ্চুরিটা জয় দিয়ে রাঙিয়ে রাখতে পারেননি। তাকে ছাপিয়ে ম্যাচের নায়ক হয়ে যান রাজশাহীর হয়ে ৭৬ রান করা আফিফ হোসেন। বিপিএলে প্রথমবারের মতো ম্যাচ সেরার পুরস্কার দেওয়া হয় যুগ্মভাবে, আফিফ ও মালানকে।
এবং দর্শক
বরাবরই মাঠের ‘প্রাণ’ বলা হয় দর্শককে। যতই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হোক না কেন, দর্শক ছাড়া খেলা জমে নাকি! অথচ এবারের বিপিএলে ঢাকা পর্বের মতো দর্শক খরা ছিল চট্টগ্রামেও।
চট্টগ্রামে সাধারণ বিপিএল কিংবা আন্তর্জাতিক ম্যাচ হলেই উপচে পড়ে দর্শক। অথচ এবার ছিল ভিন্ন চিত্র। শুক্রবার ছুটির দিনেই দর্শক সংখ্যা যা একটু চোখে পড়ার মতো ছিল। এছাড়া বাকি যে পাঁচদিন খেলা হয়েছে, গ্যালারির বেশ বড় একটা অংশই ফাঁকা পড়ে ছিল। বিপিএল নিয়ে বন্দর নগরীতে তেমন প্রচারণাও চোখে পড়েনি সেভাবে।
চট্টগ্রাম/পরাগ
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/35UIB2H
0 comments:
Post a Comment