
লোকসানি চিনিকলও অর্থ বরাদ্দ চায়
কেএমএ হাসনাতরাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ১৫টি চিনিকলে গত ১৬ বছরে প্রায় ৩ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। তারপরও নতুন মৌসুমের আখ কিনতে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) নতুন করে বরাদ্দ চেয়েছে।
বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) পর এবার বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনও (বিএসএফআইসি) অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আখ কেনার জন্য টাকা চেয়ে চিঠি দিলো।
কয়েকদিন আগে বিজেএমসি কাঁচা পাট কেনার জন্য ১ হাজার কোটি টাকার আবর্তক তহবিল চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়।
সূত্র জানায়, চলতি আখ মাড়াই মৌসুমে মূলধন জোগান হিসেবে ভর্তুকি ও ট্রেড গ্যাপ সমন্বয়ের শর্তে বিএসএফআইসি ১৩৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা চেয়েছে।
চলতি বছরের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আখ মাড়াই মৌসুমে বিএসএফআইসির ১৫টি আখকলে ৫৪৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে। কারণ, ১ দশমিক ২৫ লাখ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করতে ১৫ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন আখ প্রয়োজন।
সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব হাসিনা বেগম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল রউফ তালুকদারের কাছে বিএসএফআইসি এ অর্থ চেয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর সরকারি আখ কলগুলো সারা দেশে চিনি সরবরাহ করত। সরকারি সরবরাহে দেশে চিনিতে কোনো ধরনের সংকট দেখা দেয়নি। ২০০২ সালের পর বেসরকারি চিনিকল স্থাপন শুরু করলে এর প্রধান শর্ত ছিল- কলগুলোকে মোট উৎপাদনের ৫০ শতাংশ বিদেশে রপ্তানি করতে হবে। কিন্তু বেসরকারি চিনিকলগুলো সেই শর্ত না মেনে স্থানীয়ভাবে চিনি বিক্রি শুরু করে।
অন্যদিকে, সরকারি চিনির দাম হেরফেরের জন্য রাষ্ট্রীয় চিনিকলের চিনি মজুদ বাড়তে থাকে। এই অবস্থা চলতে থাকায় সরকারি চিনিকলগুলো বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় চিনিকলগুলো বছরের পর বছর ধরে শুধু লোকসান গুনে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে চিনি বিক্রি করে তারা লাভ করবে, এমন আশাও নেই। সরকারি চিনিকলের এই লোকসানের দায় বইতে হচ্ছে দেশের মানুষকে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বিএসএফআইসির অধীনে থাকা ১৫টি চিনিকলে গত ১৬ বছরে প্রায় ৩ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হিসাবে করপোরেশনের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ২০১৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, চিনি শিল্প করপোরেশনের কাছে সরকারের বকেয়া পাওনা (ডিএসএল) প্রায় ৩৮৩ কোটি টাকা। বাজারদরের চেয়ে সরকারি চিনির উৎপাদন খরচ অনেক বেশি হওয়াই এ লোকসানের কারণ।
বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের (বিটিসি) এক সমীক্ষা অনুযায়ী, এক কেজি সরকারি চিনি উৎপাদনে খরচ হয় ৮৮ টাকা। তা এখন বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা দরে। চিনিকলগুলোতে শুধু চিনি উৎপাদন করে লাভের আশা না থাকায় সরকার এখন সেগুলোতে চিনির উপজাত থেকে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে। এজন্য বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করছে শিল্প মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে কয়েকটি চিনিকল ঘুরে দেখেছে চীনা বিনিয়োগকারীরা। এ তালিকায় সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে আলোচনায় থাকা রংপুর চিনিকলটিও আছে।
প্রথম প্রজন্মের শিল্পগুলোর একটি চিনিকল। স্বাধীনতার আগে ও পরে সরকারি চিনিকলগুলোই দেশের চাহিদা পূরণ করত। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এসব চিনিকলের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়নি। আখচাষ বাড়ানোরও উদ্যোগ ছিল না। এর বিপরীতে বেসরকারি খাতে বিপুল উৎপাদন ক্ষমতার মিল চালু হয়েছে।
ফলে বাজারে সরকারি চিনিকলের ভূমিকা এখন গৌণ হয়ে গেছে। দুটি বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর এখন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা বিএসএফআইসির আওতায় চিনিকল আছে ১৫টি। এসব চিনিকলের তিনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্রিটিশ আমলে, নয়টি পাকিস্তান আমলে ও তিনটি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। এদের মোট উৎপাদনক্ষমতা মাত্র ২ লাখ ১০ হাজার টন।
বেসরকারি চিনিকল মাত্র দুটি- দেশবন্ধু চিনিকল লিমিটেড এবং কালিয়া চাপড়া চিনিকল লিমিটেড। পাঁচটি চিনি পরিশোধনকারী সংস্থা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- আব্দুল মোনেম সুগার মিল এবং এস আলম রিফাইনারি সুগার মিল।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে এখন বছরে ১৪ লাখ টন পরিশোধিত চিনির প্রয়োজন হয়। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে সরকারি চিনিকলে উৎপাদিত হয়েছে মাত্র ৫৮ হাজার টন চিনি। এর বিপরীতে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের চিনি উৎপাদনক্ষমতা ১৫ লাখ টন।
ঢাকা/হাসনাত/রফিক
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/2QQ7Qyn
0 comments:
Post a Comment