
কন্ট্রোল রুম মিরপুরে, আস্তানা বসুন্ধরায়
মামুন খানরাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে ভয়ংকর হামলার ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালের ১ জুলাই। জঙ্গিরা সেদিন যেন রক্তের হলি খেলায় মেতে উঠেছিল। তাদের হামলায় দুই পুলিশ সদস্য, ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ নিহত হন ২২ জন। কূটনৈতিক এলাকায় এরকম একটি হামলা হবে তা কেউ কল্পনাও করেনি।
সে দিনের সেই ভয়ংকর হামলার চিত্র ফুটে ওঠে পুলিশের দেয়া চার্জশিটে। ওই চার্জশিটের আলোকে ঘটনার বিশদ রাইজিংবিডি পাঠকদের জন্য তুলে ধরছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মামুন খান। ধারাবাহিক বর্ণনার আজ অষ্টম পর্ব।
হামলার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতারা রাজধানীর মিরপুরে (৪৪১/৮, শাপলা সরণি, পশ্চিম শেওড়াপাড়া) একটি কন্ট্রোলরুম খোলে। অন্যদিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে সেটি আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে। যেখানে অবস্থান নেয় শীর্ষ নেতাসহ হামলাকারীরা।
হামলার দিন তামিম চৌধুরী ও মারজান এই কন্ট্রোল রুমে গিয়ে উঠেছিল। নব্য জেএমবির অন্যান্য সদস্য পল্লবী, রূপনগর, কল্যাণপুর আরো বাসা ভাড়া নিয়ে পরিবারসহ অবস্থান করে আসছিল। এছাড়া নারায়নগঞ্জের পাইকপাড়ায় আরো একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিল তারা।
শীর্ষ নেতারা হামলাকারীদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করে
নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীসহ তিনজন আত্মঘাতি পাঁচজনের সাথে অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ করে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করে। এজন্য তারা দফায় দফায় বৈঠক করেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলে যাচাই-বাছাই। সেই সব জঙ্গিদের বাছাই করা হয় যারা জীবন গেলেও পিছু হটবে না। এ ধরনের পাঁচজনকে বাছাইয়ের পর তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কয়েক ধাপে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা তাদের মগজ ধোলাই করেন। ধারণা দেন, মারা গেলে তারা জান্নাতে যাবে।
চার্জশিটে বলা হয়, বসুন্ধরার বাসায় সংগঠনের ইশতিহাদি সদস্য (সুইসাইডাল স্কোয়াড) মীর সামেহ্ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বলসহ তামিম চৌধুরী, বাশারুজ্জামান চকলেট, নুরুল ইসলাম মারজান, রাজীব গান্ধী ও অন্যরা অবস্থান করছিল।
তামিম চৌধুরী, শরীফুল ইসলাম খালেদ ও নুরুল ইসলাম মারজান অ্যাপসের মাধ্যমে তাদের সাথে যোগাযোগ করে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করে। তারা কথিত জিহাদে যেতে রাজি হলে তামিম চৌধুরীসহ অন্যরা নির্দিষ্ট দিনে তাদের নির্দিষ্ট জায়গায় আসতে বলে। পরে র্যাশকে দিয়ে তাদের পিক করায়।
হলি আর্টিজানে হামলার আগে রেকি
হামলার জন্য হলি আর্টিজানে নিরাপদে পৌঁছতে জঙ্গিরা পুরো গুলশান এলাকা রেকি (পর্যবেক্ষণ) করে। চার্জশিটে বলা হয়, তামিম চৌধুরীর নির্দেশে র্যাশ বিদেশি নাগরিকদের হত্যার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গুলশান পার্ক ও হলি আর্টিজান বেকারি রেকি করে।
গুলশান পার্ক রেকি করে সে দেখতে পায়, বিকেল চারটা থেকে ৬ টার মধ্যে পার্কে ২৫/৩০ জন বিদেশি নাগরিক ব্যায়াম করছে। পরবর্তীতে সে আরো দুদিন হলি আর্টিজান রেকি করে। প্রথম দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে সেখানে প্রবেশ করার সময় দারোয়ান তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে, র্যাশ নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরিচয়ে ভুয়া আইডি কার্ড দেখায়।
র্যাশ হলি আর্টিজানের ভেতরে প্রবেশ করে সেখানে ৮/১০ জন বিদেশী নাগরিককে দেখতে পায়। পরদিন আবার হলি আর্টিজানের বাইরে থেকে চারপাশ রেকি করে। সেদিনও সে ১০/১২ জন বিদেশী নাগরিক দেখতে পায়। র্যাশ রেকির বিষয়টি তামিম চৌধুরীকে জানায়।
এরপর তামিম চৌধুরী মোবাশ্বের, রোহান, নিবরাস, খায়রুল ও উজ্জলকে সঙ্গে নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে রেকি করার জন্য মারজান, বাশারুজ্জামান ও রাজীব গান্ধীকে নির্দেশ দেয়। তারা ২৭ জুন আছরের নামাজের পর হলি আর্টিজান বেকারিসহ লেডিস ক্লাব, যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা পার্ক, বনানী কফি সপ প্রভৃতি স্থান রেকি করে রাতে বাসায় ফেরে। পরদিন সন্ধ্যায় আবার বাশারুজ্জামান, উজ্জ¦ল খায়রুল ইসলামকে নিয়ে হলি আর্টিজানে যায়। বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ করে রাত সাড়ে ১০টার বসুন্ধরার বাসায় ফিরে আসে।
সবাই মিলে রেকি করার পর বসুন্ধরার বাসায় বসে তামিম চৌধুরীর সাথে বিস্তারিত আলোচনা করে। তামিম চৌধুরী সবার কাছ থেকে রেকির বিষয়ে অবগত হওয়ার পর নিজে রোহান, মোবাশ্বের, নিবরাস, পায়েল ও উজ্জ্বলকে সঙ্গে নিয়ে ২৯ জুন বিকেলে লেডিস ক্লাব, যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা পার্ক, বনানী কপি সপ এবং সন্ধ্যার পর হলি আর্টিজানে রেকি করে রাত ১১ টায় বাসায় ফেরে।
চার্জশিটে বলা হয়, ৩০ জুন বেলা ১১টায় সেখানে তামিম চৌধুরী, সরোয়ার জাহান হামলার বিষয়ে সবাইকে নিয়ে মিটিংয়ে বসে। তারা সিদ্ধান্ত নেয়- গুলশান পার্ক, লেডিস ক্লাব, বারিধারায় বিদেশি নাগরিকেদের যাতায়াত কম। তাই সেসব স্থানে হামলার পরিকল্পনা বাদ। হামলার জন্য হলি আর্টিজানকেই বেছে নেয় তারা।
সবাই মিলে জোহরের নামাজের পর সরোয়ার জাহান হামলাকারীদের জানায়, আগামীকাল (১ জুলাই ২০১৬) হলি আর্টিজানে অপারেশন হবে। সেখানে বিদেশিদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। তারপর সরোয়ার হামলাকারী পাঁচজনের উদ্দেশ্যে বলে, তোমরা হলি আর্টিজানে হামলার সময় কখনো হতাশ হবে না, একজনের গুলি শেষ হলে আরেকজন ব্যাকআপ দিবে। মনে রাখবে আমাদের হারানোর কিছু নেই। কোন মুশরেকদের ওপর দয়া দেখাবে না। এমনকি সে যদি সাংবাদিকও হয়। সর্বদা জিকিরের মধ্যে থাকবে। কেউ যদি বন্দি হয়ে যাও তাহলে সে নিজেকে নিজেই শেষ করে দেবে। আমরা যদি হলি আর্টিজান গেট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারি তাহলে আমরা সফল। কারণ বিশ্ব দেখবে, বাংলাদেশেও হামলা হয়েছে।
১ জুলাই সকাল ১০টায় বাশারুজ্জামান রোহান, নিবরাস এবং মোবাশ্বেরের ব্যাগে তিনটি বড় অস্ত্র, তিনটি পিস্তল, তিনটি গ্রেনেড, পর্যাপ্ত পরিমাণ অস্ত্রের গুলি ও বিস্ফোরক এবং উজ্জল ও পায়েলের ব্যাগে পিস্তল, চাকু, বিস্ফোরক ঢুকিয়ে দেয়। এরপর সবাই বাসায় নামাজ পড়ে।
বিকেল ৫টার দিকে রোহান, নিবরাস, মোবাশ্বের অস্ত্র-গুলি ও বিস্ফোরকের ব্যাগ নিয়ে হলি আর্টিজানের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উজ্জ্বল ও পায়েল অস্ত্র-গুলি ও বিস্ফোরকের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে হলি আর্টিজান বেকারির উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়।
হামলাকারী পাঁচজন প্রত্যেকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বলে জান্নাতে দেখা হবে ইনশাআল্লাহ। সন্ধ্যা ৬টার দিকে বাশারুজ্জামান রূপনগর এবং তানভীর কাদেরী স্বপরিবারে রূপনগরে একটি বাসায় ওঠে। মেজর জাহিদ ও তার পরিবার রূপনগর আবাসিক এলাকায় আগে থেকেই অবস্থান করে হামলার বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখছিল।
ঢাকা/এনএ
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/37zIHOk
0 comments:
Post a Comment