
পোড়া লাশের গন্ধ নিয়ে দাঁড়িয়ে তাজরীন ভবন
আরিফুল ইসলাম সাব্বিরসকালের রোদ স্নিগ্ধ থাকতেই ভবনে এক সময় মানুষের কোলাহল বাড়তে শুরু করতো। মানুষের ভিড়ে ভবনজুড়ে ছড়িয়ে পড়তো কর্মব্যস্ততা। কিন্তু একদিনের ভয়ানক নৃশংসতায় সেই ভবন হয়ে গেছে জনশূন্য, ভূতুড়ে। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর গত সাত বছর ভবনটি পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়।
২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সাভার উপজেলার আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে মারা যায় ১১৩ জন শ্রমিক। আর সেই থেকে পুড়ে যাওয়া হতদরিদ্র শ্রমিকদের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে আট তলা বিশিষ্ট ভবনটি। আজও ভবনের ভেতর আটকেপড়া মানুষের আর্তচিৎকার আর দাউ দাউ আগুনের লেলিহান শিখা চোখে ভাসে স্থানীয়দের।
বৃস্পতিবার তালাবন্ধ ভবনের পাশে গিয়ে দেখা গেল পুড়ে যাওয়ার ক্ষত আজও স্পষ্ট। সেদিনের আগুনের প্রচণ্ড তাপে বেঁকে যাওয়া জানালার গ্রিল ও এডজাস্ট ফ্যানের পাখা সেভাবেই পড়ে রয়েছে। ভবনের দেয়ালে পোড়া কালো দাগ। এক সময়ের কোলাহল মুখরিত পরিপাটি ভবনের চারপাশে ভুতুড়ে পরিবেশ। নির্জন ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে নির্মমতার সাক্ষী হয়ে।
এলাকাবাসীদের অনেকের মতে, ভবনের কিছু অংশে মেরামত করা হয়েছে। ভেতরে মালিকের লোক পাহারায় থাকে। মাঝে মধ্যে দু’-একটি কাভার্ডভ্যানও ভেতরে দেখা যায়। দেখভালের সার্বক্ষণিক দায়িত্বে রয়েছেন বয়স্ক এক ব্যক্তি। এই লোকটি অগ্নিকাণ্ডের বছর পূর্তির সময় এলে বাড়তি সতর্ক থাকেন। এই সময় সাংবাদিকরা এসে এবং কেউ কেউ ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তাদের প্রধান ফটকে আটকে দেন তিনি। সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো বিষয়ে কথাও বলেন না তিনি।
কথা হয় ভবনের পাশের কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিলেন তারা। বললেন, সেদিন সন্ধ্যার দিকে কারখানার নিচ তলার তুলার গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা পুরো আট তলায় ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় কারখানা কর্মরত সহস্রাধিক শ্রমিক জীবন বাঁচাতে নামার চেষ্টা করেন। জীবন বাঁচাতে তারা চিৎকার করছিলেন। আজও কানে বাজে সেই 'বাঁচাও’ ‘বাঁচাও' আর্তনাদ।
তারা বলেন, সকাল হলেই একসময় যে কারখানা কর্মব্যস্ত থাকতো, অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে এখন অব্দি এটি বন্ধ পড়ে আছে। কেউ না আসায় শুনশান নীরবতা বিরাজ করে। এত বড় ভবনটি এখন পরিত্যক্ত।
তাজরীন ফ্যাশনসের এই কারখানার স্থানে সরকারিভাবে শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল ও ডরমেটরি নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র সাভার-আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় যখন জীবন বাঁচাতে শ্রমিকরা চিৎকার করছিলেন; তখনো খুনি মালিক দেলোয়ার হোসেন কারখানা থেকে বের হওয়ার সব গেটে তালা লাগিয়ে রাখেন। প্রাণে বাঁচতে অনেক শ্রমিক ভবনের বিভিন্ন তলা থেকে লাফিয়ে পড়েন।
এটা ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বর্ণনা করে আইএলও কনভেনশন-১২১ অনুসারে শ্রমিকদের সারা জীবনের আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদান, পুনর্বাসনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও সন্তানদের লেখাপড়া নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
তাজরীন ফ্যাশনসের এই কারখানার স্থানে সরকারিভাবে শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল ও ডরমেটরি নির্মাণ করার দাবি জানান এই শ্রমিক নেতা।
সাভার/আরিফুল ইসলাম সাব্বির/বকুল
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/2XHU7ev
0 comments:
Post a Comment