
বন্ধ হয়ে গেছে একাত্তরের বীরকন্যার সম্মানী ভাতা!
মাইনুদ্দীন রুবেলব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে বন্ধ হয়ে গেছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের এক বীরকন্যা সায়রা বেগমের মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা। এমনকি আগের উত্তোলনকৃত ভাতাও ফেরত চাওয়া হয়েছে তার কাছে।
২০১৬ সাল থেকে মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা পেয়ে আসছিলেন সায়রা বেগম।
জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের পরিপত্রের চার শর্তের কোন শর্ত পূরণ করতে না পারায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর টেলিফোনিক নির্দেশে সায়রা বেগমসহ বিজয়নগর উপজেলার ৬১ মুক্তিযোদ্ধার ভাতা স্থগিত করেছেন বিজয়নগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার।
সায়রা বেগম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে দেশের পূর্ব রণাঙ্গনে রেখেছিলেন অনন্য অবদান। যার অবদানের কথা ৩ নং সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক সেনা প্রধান কে এম সফিউল্লাহ, সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল সাঈদ সহ স্থানীয় গবেষকরাও তাদের স্মৃতি কথা ও গবেষণা গ্রন্থে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছেন ।
জানা যায়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় সায়রার বয়স ছিল ১৭/১৮ বছর । তার বাবা আবদুল আজিজ চৌকিদার ছিলেন এলাকার কুখ্যাত রাজাকার। পাক হানাদার বাহিনীর অনুকম্পা লাভের আশায় ও দ্বিতীয় স্ত্রীর প্ররোচণায় তার নিজ কন্যা মা হারা সায়রাকে একদিন মুকুন্দপুর ক্যাম্পে নিয়ে যান রাজাকার বাবা। এ সময় হানাদাররা তাকে ক্যাম্পেই রেখে দেয়। বেশ কিছুদিন তাকে ক্যাম্পের বাইরে যেতে দিত না তারা। সায়রা পাক হানাদারদের বিশ্বস্ততা অর্জন করতে সক্ষম হওয়ায় পরে তাকে ক্যাম্পের বাইরে যেতে অনুমতি দেয় তারা।এরপর ক্যাম্পের বাইরে যাওয়া-আসার সুযোগে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সায়রার যোগাযোগ তৈরি হয়। ক্যাম্পে চলাচলে তার ওপর থেকে বিধিনিষেধ ওঠে যাওয়ায় সেও তার কিশোরীসুলভ চলাফেরার মাধ্যমে ক্যাম্পের যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্রের অবস্থান
পঙ্খানুপুঙ্খভাবে অবলোকন করে এসব তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে সরবরাহ করেন। সায়রার দেয়া তথ্য পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা দ্রুত মুকুন্দপুর ক্যাম্প আক্রমণের পরিকল্পনা গ্রহন করে। লেফটেন্যান্ট সাঈদের নেতৃত্বে একাত্তরের ১৮ নভেম্বর রাতে মুক্তিযোদ্ধারা মুকুন্দপুর ক্যাম্প আক্রমণ করে। ১৯ নভেম্বর মুক্ত হয় মুকুন্দপুর। এতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাকসেনা নিহত হয় এবং ২৯জন আত্মসমর্পণ করে।
এদিকে দেশ স্বাধীনের পর সায়রা বেগম এলাকা থেকে নিরুদ্দেশ হন। তিনি পরে নোয়াখালীতে বিয়ে করে ওখানে ঘর সংসার করতে থাকেন । প্রায় ৩২ বছর ঘরসংসার করার পর প্রায় ১৫/১৬ বছর আগে এলাকায় এসে মুকুন্দপুর সংলগ্ন সেজামোড়া রেললাইনের পাশে জমি কিনে বসবাস শুরু করেন ।
২০১১সালের ১৯ নভেম্বর মুকুন্দপুর মুক্ত দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ৩নং সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক রাস্ট্রদূত মেজর জেনারেল সাঈদ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সায়রা বেগমের অবদানের কথা বর্ণনা করার সময় আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। এ অনুষ্ঠানের পর জেনারেল সাঈদ সায়রা বেগমকে এক প্রত্যয়ন পত্রে (৩ জানুয়ারি ২০১৩) স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করে তাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিদানের জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন। একই অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ভারতীয় মিত্র বাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল একে বর্মা ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অভীম চন্দ্র শুক্লা উপস্থিত ছিলেন।
এর পর থেকে মুক্তিযোদ্ধা সায়রা বেগম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধদের সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতার আবেদন করার পর ২০১৬ সালের জুলাই মাস থেকে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান । কিন্তু চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিজয়নগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রীর টেলিফোনিক নির্দেশের উদ্ধৃতি দিয়ে সায়রা বেগমসহ বিজয়নগর উপজেলার ৬১ জন মুক্তিযোদ্ধার ভাতা স্থগিত করেন এবং একই চিঠিতে তাদেরকে ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে গৃহীত ভাতা ফেরত দেওয়ারও নির্দেশ দেন।
এ কথা শোনার পর সায়রার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। সায়রা বেগমের সাথে মোবাইল ফোনে কথা হলে তিনি বলেন, ভাতা বন্ধ করলে বৃদ্ধ মা, স্বামী পরিত্যক্তা কন্যা ও নাতনিকে আমি কিভাবে চালাবো? জীবন বাজী রাইখ্যা মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য দেওয়া কী আমার অপরাধ হইছে ?
তিনি জানান,দীর্ঘদিন রোগ ভোগের পর তার স্বামী গত বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি মারা গেছেন। স্বামীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে গেছেন। তার বসবাসের ঘরটিও জরাজীর্ণ। টিনের চালায় অসংখ্য ফুটো। তিনি দুঃখ করে বলেন, ভাতা না পাইলে আমি কি খামু বৃষ্টিবাদলার দিনে এ ঘরে কেমনে থাকুম?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক সেনা প্রধান মেজর জেনারেল কে,এম সফিউল্লাহ’র লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ’, মেজর কামরুল হাসান ভূইয়া’র ‘একাত্তরের কন্যা জায়া জননী’ এবং স্থানীয় গবেষক কবি জয়দুল হোসেনের লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ গ্রন্থে ঐতিহাসিক মুকুন্দপুর যুদ্ধে সায়রা বেগমের ভূমিকা ও অবদানের বর্ণনা লিপিবদ্ধ রয়েছে।
বিজয়নগর উপজেলার সাবেক কমান্ডার হাবিলদার তারা মিয়া বলেন, ‘সায়েরা বেগম একজন সাহসী নারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ৩নং সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক রাস্ট্রদূত মেজর জেনারেল সাঈদকে যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর কাছ থেকে তথ্য এনে দেওয়াসহ অনেক সাহায্য সহযোগীতা করেন সায়েরা বেগম।'
তিনি বলেন, ‘সায়রা বেগমসহ ৬১ মুত্তিযোদ্ধার ভাতা বন্ধসহ ফেরত চাওয়ার ঘটনা নিন্দনীয়। আমরা অনতিবিলম্বে এই দুইটি আদেশ বাতিলের দাবি জানাই, অন্যথায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় শত শত মুক্তিযোদ্ধা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইব।'
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, গেরিলা কমান্ডার ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আল মামুন সরকার বলেন, ‘সায়রা বেগম একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এইটা বলার কোন অবকাশ নেই। এমন সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যই আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি। মন্ত্রণালয় এইটা ভুলে করেছে।'
বিজয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহের নিগার বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য কিছু তথ্য প্রমাণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যাদের এসব কাগজপত্র নেই কিংবা যারা এসব কাগজ জমা দিতে পারেননি তাদেরকে তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ভাতা ফেরত দিতে বলা হয়েছে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আপিল করার সুযোগ রাখা আছে শুনেছি, তারা আপিলও করেছেন।'
ব্রাহ্মণবাড়িয়া/টিপু
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/2y8dSTF
0 comments:
Post a Comment