
বাংলাদেশে চিকিৎসা বনাম অশুচি
নিজাম গাজীআমরা সবাই কমবেশি সোনার হরিণের কথা শুনেছি, কিন্তু কখনো দেখা হয়নি। যদি সত্যিকার কেউ কখনো সোনার হরিণ দেখে থাকেন, তাহলে সেটি সুচিকিৎসা পাওয়ার মতোই ব্যতিক্রম।
চিকিৎসা জগতের ৩টি শব্দ হচ্ছে অপচিকিৎসা, সুচিকিৎসা চিকিৎসা (অশুচি)। মূলত সুচিকিৎসা শব্দটি এসেছে অপচিকিৎসার কারণেই। যদি বাংলাদেশে সত্যিকার চিকিৎসা হতো তাহলে সুচিকিৎসা শব্দটি আমাদের শুনতে হতো না। আমাদের দেশের কোটিপতি ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। তার মানে, তারা জানেন, যে আসলে বাংলাদেশে সুচিকিৎসা নেই। এখন অবশ্য অনেক সাধারণ মানুষও দেশের চিকিৎসার উপর থেকে আস্থা হারিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ অন্যান্য দেশে যাচ্ছেন চিকিৎসার জন্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এরা সবাই চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাচ্ছেন? প্রশ্নটির উত্তর অত্যন্ত সহজ, আর তা হলো- দেশে সুচিকিৎসা পাওয়া যায় না বলে এরা বিদেশ যাচ্ছেন।
এবার প্রশ্ন, বাংলাদেশে কেন সুচিকিৎসা পাওয়া যায় না? বাংলাদেশের প্রত্যেক উপজেলায় সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। জেলা ও বিভাগীয় শহরে রয়েছে একাধিক সরকারি হাসপাতাল। জাতীয় পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ অসংখ্য সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। রয়েছে অসংখ্য চিকিৎসক, নার্স, উন্নত ল্যাব, পরীক্ষাগার ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। এছাড়া সারা বাংলাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো রয়েছে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ইত্যাদি। তাহলে, বাংলাদেশের মানুষ সুচিকিৎসা থেকে কেন বঞ্চিত হচ্ছেন?
আসুন একটু দেখা যাক, যে আমরা কেন সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। বাংলাদেশে যে প্রতিনিয়ত অনেক রোগী অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন এটি পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশন খুললেই পাওয়া যায়। কিন্তু সুচিকিৎসার খবর পাওয়া ওই সোনার হরিণের মতোই কঠিন। যদি প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীগণের হস্তক্ষেপে চিকিৎসা করানো হয়, তাহলে অনেকেই সুচিকিৎসা পান, এর অনেক উদাহরণ বাংলাদেশে আছে। তাহলে বুঝতেই পারা যায়, যে সাধারণ মানুষ কেন সুচিকিৎসা পাচ্ছে না।
সাধারণ মানুষের সুচিকিৎসা না পাওয়ার প্রধান কারণ হলো গাফিলতি, দুর্নীতি, প্রাইভেটভাবে রোগী দেখার প্রবণতা, অস্বচ্ছ প্রেসক্রিপশন, রোগীদের যথেষ্ট সময় না দেয়া, রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীলতার অভাব, অতিরিক্ত ও অস্বচ্ছ টেস্ট এবং সরকারের যথাযথ মনিটরিং ও জবাবদিহিতার অভাবসহ বিবিধ। যদিও কিছু ডাক্তার আছেন, যারা অনেকটাই ভালো মনের। কিন্তু অধিকাংশ ডাক্তারের মধ্যে রয়েছে গাফিলতি, দুর্নীতি ইত্যাদি। ফলে, রোগীরা সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
একজন রোগী যখন সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারের নিকট যান, তখন অনেক ডাক্তার তাকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করেন, যে তার কোনো রেফারেন্স আছে কিনা। ভাবা যায়! চিকিৎসা করাতে হলেও রেফারেন্সের দরকার হয়। যার রেফারেন্স থাকে, তার চিকিৎসা সেই রেফারেন্স অনুযায়ী হয়, আর যায় রেফারেন্স নেই, তাকে অনেক সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার বসতে পর্যন্তও বলেন না। ডাক্তার রোগীকে সময় দিতেই চান না। তড়িঘড়ি করে রোগীর সমস্যা ভালো মতো না শুনে প্রেসক্রিপশন করে দেয়। অথচ রোগীর কিন্তু অনেক কিছু বলার থাকে। এরপর সরকারি হাসপাতালে যেহেতু ওষুধ দেয়া হয়, সেহেতু রোগীকে দু,একটি ওষুধ দিয়ে বলে অন্য ওষুধগুলোর সাপ্লাই নেই, আপনি বাইরে থেকে কিনে নিন। কিন্তু একজন অসহায়, গরীব ব্যক্তি এতগুলো টাকার ওষুধ কীভাবে কিনবেন, সে খোঁজ নেন না।
এরপর অধিকাংশ ডাক্তার রোগীর সাথে ভালো ব্যবহার করেন না। অথচ ডাক্তারের ভালো ব্যবহারই হতে পারে রোগীর সুস্থ হওয়ার অন্যতম হাতিয়ার। তারা চিন্তা করেন, এই রোগী দেখলে সে যত বেতন পাবে, না দেখলেও ঠিক সেই একই বেতন পাবে। তাহলে রোগীকে সময় দেয়ার কী দরকার। ডাক্তার তড়িঘড়ি করে রোগী দেখেন এই কারণে যে, সে তার প্রাইভেট চেম্বারে গিয়ে পাঁচশো থেকে শুরু করে এক হাজার, দেড় হাজার টাকা ফি নিয়ে রোগী দেখবেন। এতগুলো টাকা ধনী ব্যক্তিরা ফি দিয়ে চিকিৎসা নিতে পারে। কিন্তু গরীব, অসহায় লোকেরা এত টাকা কোথায় পাবে?
এরপর আবার হাসপাতালে গরীব রোগীদের কেবিন পাওয়া সরকারি চাকরি বা সোনার হরিণের চেয়েও কঠিন ব্যাপার। অনেক অসহায় রোগীর ঠাঁই হয় হাসপাতালের বারান্দায়। এরপর করাতে হয় বহু টেস্ট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে টেস্ট করাতে হয়। এতে রোগী আরো অসুস্থ হয়ে পড়ে। টেস্টের রিপোর্ট পেতে সাধারণত এক সপ্তাহ লেগে যায়। আবার কখনো সে রিপোর্ট থাকে অস্বচ্ছ ও ভুল।
আমাদের দেশের অধিকাংশ ডাক্তারের হাতের লেখা খুব অস্পষ্ট। যা অনেক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি ও বুঝতে পারেন না। অথচ এই অস্বচ্ছ প্রেসক্রিপশনের কারণে প্রতিবছর আমাদের দেশে অনেক লোক ভুল ওষুধ সেবন করে মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে। তাই সরকারের উচিৎ প্রেসক্রিপশন কম্পিউটারে টাইপ করে দেয়া বাধ্যতামূলক করা। অবশ্যই প্রত্যকটি ওষুধের নামের পাশাপাশি ওষুধের গ্রুপের নাম ও কোম্পানির নাম ও উল্লেখ করা। এটি ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণসহ সুচিকিৎসার অন্যতম একটি হাতিয়ার হবে। তাছাড়া, নিম্নমানের কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ও ডাক্তারের স্বেচ্ছাচারিতাও অনেকাংশে দূর হবে। কিন্তু সরকার কি এমন ব্যবস্থা করবে?
এ কথা আর নতুন করে বলতে হয় না, যে সরকারি হাসপাতালের চেয়ে বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায়। যাদের একটু টাকা পয়সা আছে, তারা কখনো সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যায় না। কারণ, তারা জানে, যে সরকারি হাসপাতালের এমন হালচাল। অতি দুঃখজনক হলেও সত্য, যে সরকারি হাসপাতালে যে ডাক্তার রোগীর সাথে বাজে আচরণ করেছে ও পর্যাপ্ত সময় দেয়নি সেই একই ডাক্তার বেসরকারি হাসপাতালে একই রোগীর সাথে ফেরেস্তার মতো আচরণ করবে এবং পর্যাপ্ত সময় দেবে। কিন্তু বেসরকারি এইসব হাসপাতালের সমস্যা হচ্ছে, এখানে প্রচুর টেস্ট দেয়া হয়। টেস্ট না লাগলেও ডাক্তার অসংখ্য টেস্ট দিয়ে থাকে। কেননা, এটা ওই বেসরকারি হাসপাতালের বড় ধরনের একটা ব্যবসা এবং ওইসব টেস্ট থেকে ডাক্তার ভাগ পেয়ে থাকে।
তাছাড়া প্রত্যেক ডাক্তারই ওষুধ কোম্পানির গ্যাঁড়াকলে আটকা। তাদের নিকট থেকে ডাক্তার ঘুষ নেয় বলেই প্রেসক্রিপশনে সেইসব নিম্নমানের কোম্পানির ওষুধ লিখে থাকে। তাহলে সুচিকিৎসা আর পাওয়া গেল কই?
এছাড়া ভুয়া সনদধারী ডাক্তার, নার্স অদক্ষ স্টাফ ইত্যাদি সুচিকিৎসার পথে অন্যতম দায়ী। তাছাড়া রয়েছে যথাযথ জবাবদিহিতা ও সরকারের যথেষ্ট মনিটরিংয়ের অভাব।
অনেক রোগী আছেন অপচিকিৎসার শিকার হয়ে চিকিৎসা জগতকে ঘৃণা করা শুরু করেন। তাই সরকারের উচিৎ স্বাস্থ্য নীতিমালায় পরিবর্তন এনে, জবাবদিহি নিশ্চিত করে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। সোনার হরিণের মতো কঠিন নয়, বরং সুচিকিৎসা পৌঁছে যাক বাংলাদেশের সব গরীব ও অসহায় মানুষের দ্বারে দ্বারে, সেটাই প্রত্যাশা সবার।
লেখক: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি পিসি কলেজ।
বাগেরহাট/হাকিম মাহি
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/2woNHaf
0 comments:
Post a Comment