
সুরের সাধক সুনির্মল
মাহফুজ কিশোরযখনই তার সাথে দেখা হয়, হাতে একটি বাদ্যযন্ত্র দেখা যায়, আর মুখ দিয়ে কী যেন গুনগুন শব্দ করে বলতে থাকেন। তবে বোঝা যায়, গানের মানুষ গানই গান কোলাহল বা নির্জনে। বলছি, গোপালগঞ্জ সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী সুনির্মল দাস বাপীর কথা।
তবে, তাকে সবাই সুনির্মল বলেই ডাকেন। বয়স ২৫ বছর। পেশায় ছোটখাটো একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি হলেও মজেছেন সুরের প্রেমে। কাজের অবসরে মাতেন বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সাথে। নিজ প্রতিভায় একে একে তৈরি করেছেন প্রায় অর্ধশতাধিক দেশীয় বাদ্যযন্ত্র, যাদের বেশির ভাগই ক্রমশ বিলীন হতে চলেছে বাংলা লোকসংগীতের জগৎ থেকে।
গোপালগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার গান্ধিয়াশুর গ্রামে সুনির্মলের বাড়ি। শৈশবে দূর সম্পর্কীয় দাদু কারুশিল্পী বিজয় পাণ্ডের হাত ধরেই বাদ্যযন্ত্র তৈরির কাজে সুনির্মলের হাতেখড়ি হয়। দেশীয় লোকসংগীত ও লোকসংস্কৃতিকে মনে ধারণ করে তিনি আপন হাতে তৈরি করেছেন সুরেলা ম্যাচ বাক্স, শামুক, নারিকেলের পাতা ও বড়শি-বাঁশের মিশ্রণে পাতাবীণ, কাঠের দোতারা, বেহালা, বাঁশের চটা।
আরো রয়েছে সানাই, মৃদঙ্গ, রাবণবীণা, শিঙা, ঢাক, কাড়া, খোল, করতাল, সারিন্দা, সরজ, নাকারা, ব্যাঞ্জো, শঙ্খ, খমক, একতারা, খঞ্জনি, কাহন, জলতরঙ্গ, মেরাকাচ, মন্দিরা, চুড়িছেকার, ঝুমুর, ঢোল, তবলা, ডুগডুগি, প্রেমজুড়ি, বীণবাঁশি, মোহন বাঁশিসহ প্রায় পয়ষট্টি প্রকার নানাবিধ যন্ত্র। এতসব যন্ত্রের সন্নিবেশ একত্রে দেখে যে কারো মনে হবে যেন কোনো এক প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরের সংরক্ষণে আছেন কারুশিল্পী সুনির্মল!
বাদ্যযন্ত্রগুলোর একেকটির সুর ও তাল একেকরকম। সামান্য দিয়াশলাই থেকে শুরু করে বাঁশ-বড়শির সুতার তৈরি পাতাবীণ, শামুকের খোলস কিংবা চুড়ি থেকে তৈরি চুড়িছেকার- সবগুলোই দেখতে অসাধারণভাবে আকর্ষণীয়। বাঁশ, কাঠ, বিভিন্ন গাছের পাতা, কাণ্ড, ডালপালা রয়েছে তার এসকল যন্ত্রের নির্মাণসামগ্রীতে। আবহাওয়ার পরিবর্তনে যন্ত্রগুলোর টিউনগত কোনো তারতম্য হয় না। শুধু তৈরি আর সংরক্ষণই নয়, চাহিদা নিয়ে সেগুলো বিক্রয়ের কাজটিও করেন তিনি।
একসময় আবহমান বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বাউলগান, পালাগান, যাত্রাপালা, কবিগানের আসরে যেসব গ্রামীণ এ সকল বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হতো। লালন সাঁইজি থেকে শুরু করে শত-সহস্র মরমী সাধক, শিল্পীর গানে-সুরে সঙ্গ দিয়েছে এসব বাদ্যযন্ত্র। কালের আবর্তে, বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসনে সেগুলো যেন হারিয়ে না যায় সেই চেষ্টাই করছেন সুনির্মল। বাদ্যযন্ত্র তৈরির পাশাপাশি সেগুলো নিয়ে গবেষণাও করছেন তিনি। এ সবের বেশির ভাগ যন্ত্রই তিনি বাজাতে পারেন দক্ষতার সাথে। একই সাথে পেশাগতভাবে ইলেকট্রিক মিস্ত্রি হওয়ার সুবাদে খমক, একতারা, দোতারা, সারিন্দা, বেহালা ইত্যাদি যন্ত্রে বৈদ্যুতিক সংযোগেরও প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি সফলভাবে।
সুর সাধনার পাশাপাশি সমাজসেবক হিসেবেও সুনির্মলের নাম রয়েছে। বাংলাদেশ আনসার-ভিডিপির গ্রামীণ পর্যায়ের একজন সক্রিয় সদস্য তিনি। নিজ গ্রামে বেকার সমস্যা নিরসনে যুব সমাজকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেওয়াও তার লক্ষ্য। এছাড়াও যুবকদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি গ্রন্থাগার, যেখানে বিভিন্ন শিক্ষামূলক বই সংগ্রহ করে রেখেছেন সুনির্মল। এসবের মাধ্যমে তিনি চান যুবসমাজ যেন মাদক-বেকারত্বে না ডুবে জীবনমুখী হয়।
সুনির্মল বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের বয়সী যুবকরা নানা ধরনের মাদকদ্রব্য, বৈদেশিক সংস্কৃতি ও সমাজবিরোধী কাজের নেশায় লিপ্ত। আামি চাই তাদেরকে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ চর্চায় ফিরিয়ে আনতে।’
এ লক্ষ্যেই গোপালগঞ্জ জেলা উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, সুর সংগম, শিল্পকলা একাডেমি, মা শিল্পী সাংস্কৃতিক সংগঠন, লালন একাডেমি গোপালগঞ্জ-ইত্যাদি সংগঠনে একনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন তিনি। তার জীবনাদর্শ দেখলে মনে হয়, তিনি যেন এ যুগের লালন।
চার ভাইবোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ সুনির্মলের বাবা সুনীল দাস একজন প্রাথমিক শিক্ষক। পরিবারে অভাব-অনটন থাকলেও স্বপ্নবাজ সুনির্মলের বাদ্যযন্ত্রের প্রতি নেশা কমেনি একবিন্দুও। বরং প্রতিদিন তিনি নতুন উদ্ভাবনের আশা-সম্ভাবনায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অদম্য সুনির্মলের প্রত্যাশা, কোনো একদিন তিনি সফলতার মুখ দেখবেনই। দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের মৌলিক সুর ও লোকসংগীতের প্রাচীন, মোহনীয় ও চিত্তাকর্ষক রূপটি ফিরিয়ে আনাই যেন সুনির্মলের একমাত্র ব্রত ও পথ।
সেই ভাবনার কথা বলেন তিনি অকপটে, ‘আমাদের হাজার বছরের বাঙালি লোকসংস্কৃতি, লোকসংগীত বেঁচে থাকুক আমাদের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমেই। আমরা যেন যেকোনো অনুষ্ঠানে আমাদের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করি। স্বপ্ন দেখি, একদিন আমি একজন সংগীত পরিচালক হব।’
লেখক: শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি)।
কুবি/হাকিম মাহি
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/39v5Amz
0 comments:
Post a Comment