
পুনর্জন্ম হলে স্পিনারই হতাম : গোয়ালা
ইয়াসিনব্রেক থ্রু দরকার? নাকি প্রতিপক্ষকে চেপে ধরতে হবে? অধিনায়কের মাথায় চিন্তার ভাঁজ, ড্রেসিংরুম করছে ছঁটফট, সমর্থকদের উদ্বেগ!
ষাটের থেকে আশির দশকে এমন অস্থিরতায় একজন ছিল জাদুকর। যিনি ২২ গজে আসতেন, জয় করতেন, প্রতিপক্ষকে দুমড়েমুচড়ে দিতেন। বল হাতে জাদুকরী কারুকার্যে দুশ্চিন্তার ভাঁজ সরিয়ে তৃপ্তির হাসি ফোটানো সেই জাদুকরের নাম রামচাঁদ গোয়ালা।
খেলোয়াড়ী জীবনে অনেক রথী-মহারথী ব্যাটসম্যানকে ঘূর্ণি জাদুতে খাবি খাওয়ানো বাংলাদেশের বাঁহাতি স্পিন বোলিংয়ের পথিকৃৎ রামচাঁদ গোয়ালা। বাঁহাতি স্পিনার থেকে এক সময়ে তিনি পুরোদস্তুর চায়নাম্যান। বল হাতে আর্মার, গুগলি করার পাশাপাশি নিজের উচ্চতাকে কাজে লাগিয়ে উইকেট থেকে বাড়তি বাউন্স আদায় করে নিতে পারদর্শী ছিলেন।
তাতেই কাবু প্রতিপক্ষ। তাঁর সাফল্যের ভাণ্ডার টইটুম্বুর। সেই ভাণ্ডারে আছে একই ওভারে ডি সিলভা ও আর্জুনা রানাতুঙ্গার উইকেট। দেশের প্রথম বাঁহাতি স্পিনার ধুমকেতু হয়ে এসে ধ্রুবতারার জায়গা দখল করেছিলেন। রঙিন করেছেন ক্রিকেট ক্যানভাস। ২২ গজের তুলির আঁচড় ছড়ানো স্পিনশিল্পী মুখোমুখি হয়েছিলেন রাইজিংবিডি’র। দীর্ঘ সাক্ষাৎকার জুড়েই ছিল ক্রিকেট আলাপন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া প্রতিবেদক ইয়াসিন হাসান।
জীবনের এ কঠিন সময়ে একা একা থাকছেন? কষ্ট হয় না?
রামচাঁদ গোয়ালা: একা একা তো খারাপ-ই লাগে। আগে পোলাপান নিয়ে মাঠে ছিলাম। এখন একলা পড়ে থাকি। ভালো কি আর লাগে বলেন! কষ্ট লাগে।
বিয়ে করেননি কেন?
রামচাঁদ গোয়ালা: যখন বিয়ে নিয়ে চিন্তা করার দরকার ছিল তখন ছিল শুধু ক্রিকেট। যখন ক্রিকেট শেষ হলো তখন আর বিয়ের বয়স ছিল না।
আপনার ভাতিজা বলছিল বয়স ৮৩-৮৪ হবে। ঠিক এ বয়সে এসে ক্রিকেট নিয়ে আপনি কি ভাবেন?
রামচাঁদ গোয়ালা: এখন ভাবি একটু যদি মাঠে যেতে পারতাম তাহলে কয়েকটা ছেলে নিয়ে কাজ করতাম। আর কিছু না। বাকি সবকিছু তো ঠিকঠাকই আছে।
কই ঠিকঠাক আছে…দুবার স্ট্রোক করেছেন। চোখে অস্ত্রোপচার হলো?
রামচাঁদ গোয়ালা: এগুলো তো থাকবেই। বয়স তো কম হয়নি। হাঁটলে হাঁটু ব্যথা করে। তারপরও একটু আগায় যাই লাঠি নিয়ে। কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। ফিরে আসি।
আরেকবার যদি স্টেডিয়ামে আসার সুযোগ হতো…
রামচাঁদ গোয়ালা: আবার যদি সুযোগ হতো আমি মাঠে নামতাম। আমার খেলা তো এ প্রজন্মের অনেকেই দেখেনি। একটু দেখাতাম আমি কি পারি।
সত্যিই কি মাঠে যেতে মন চায়?
রামচাঁদ গোয়ালা: এখনও যদি মাঠে যেতে পারতাম তাহলে ভালো লাগত। পোলাপানগুলোকে একটু দেখিয়ে দিতাম। সেটাও তো পারি না।
আর বল হাতে পেলে কি বোলিং করবেন?
রামচাঁদ গোয়ালা: মনে তো চায় (হাসি)। কিন্তু পারবো না। সব হাড্ডি তো ক্ষয় হয়ে গেছে।
টিভিতে খেলা দেখেন বাংলাদেশের?
রামচাঁদ গোয়ালা: আগে দেখেছি। এখন দেখতে পাই না। শুনি ওদের থেকে। চোখ কাটাইছি…কয়েকদিন আবার টিভির সামনে যেতে পারব না। ২১ দিন মনে হয়।
কিছুদিন আগে যুব দল বিশ্বকাপ জিতেছিল? খেলা দেখেছিলেন?
রামচাঁদ গোয়ালা: নাহ ওটাও দেখতে পারিনি।
আপনার খেলা নিয়ে একটু কথা বলি, আপনি বাংলাদেশের প্রথম বাঁহাতি স্পিনার। শুরুতে আপনি পেসার ছিলেন। লম্বা হওয়ার কারণে পেস বোলিংও ছিল আঁটশাঁট। কিন্তু স্পিনার হলেন কিভাবে?
রামচাঁদ গোয়ালা: আমার ক্লাবের নাম ছিল পন্ডিতপাড়া ক্লাব। ওখানে আমাদের স্যার ছিলেন ফখরুদ্দীন। উনি আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন স্পিনার হওয়ার। বললেন স্পিনার হলে আমার ভালো করার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। উনার অনুপ্রেরণাতেই আমার স্পিনার হিসেবে শুরু।
যদি পুনর্জন্ম হতো, তাহলে কি স্পিনার হতেন নাকি পেসার। নাকি কোনো ব্যাটসম্যান?
রামচাঁদ গোয়ালা: স্পিনারই হতাম। স্পিন বোলিং ছিল আমার কাজ। বল ঘোরানো ছিল আমার নেশা।
বোলিংয়ে আপনার শক্তিশালী দিক ছিল কোনটা?
রামচাঁদ গোয়ালা: আমার শক্তিশালী দিক ছিল- লেগ ব্রেক করতে করতে হঠাৎ আর্মার মেরে দিতাম। এটা ব্যাটসম্যানরা বুঝতে পারত না। এটা দিয়ে অনেক উইকেট পেয়েছি। ব্যাটসম্যানদের সামনের দিকে আনা…বল ফিঙ্গারিং করে ওদেরকে টেনে আনার কাজটা আমার বোলিংয়ে আরেকটা বড় দিক। আমার আর্মার খেলতে পারত না বড় বড় ব্যাটসম্যানরাও।
প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানরা আপনাকে এতো ভয় পেতেন কেন?
রামচাঁদ গোয়ালা: ব্যাটসম্যান তো ওই সময়ে ভালো ছিল। ভয় পেত না। হয়তো খেলতে একটু সমস্যা হতো। কিন্তু ভয় পেত না (হাসি)।
সবাই আপনার শ্রীলঙ্কান দুই গ্রেটকে আউট করার কথা মনে রেখেছে। আপনার কি মনে আছে?
রামচাঁদ গোয়ালা: ওরা যখন খেলতে এসেছিল তখন তো আর গ্রেট হয়নি। তবে শ্রীলঙ্কা দলে নিয়মিত খেলত। অনেক হাকডাক। আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ ছিল। ওদেরকে মোহামেডান নিয়ে এসেছিল। দুজনই আমার ফ্লাইটেড ডেলিভারিতে আউট হয়েছিল। এগিয়ে এসে মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়েছিল দুজনই।
আপনি যখন মাঠে কিংবা স্টেডিয়ামে পা রাখতেন তখন কেমন অনুভব হতো?
রামচাঁদ গোয়ালা: ওই মুহূর্তে হারিয়ে যেতাম। গ্যালারিতে তো দর্শক আর দর্শক। ও সময়ে ক্রিকেট খেলা মাত্র শুরু হয়েছিল। তবুও দর্শক থাকতো। মানুষ তখন বিনোদন মানেই খেলাকে বুঝতো। সেটা ক্রিকেট হোক আর ফুটবল।
বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। কেমন দেখেছিলেন মনে আছে?
রাম চাঁদ গোয়ালা: আমার শৈশব থেকেই আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি। আগে তো আওয়ামী লিগ করেছি, এখনও করি। খুব ভালো লাগত উনাকে দেখে। উনার মতো একটা শরীর, উনার মতো একজন বক্তা, উনার মতো নেতা বর্তমানে কম আছে। অন্যরকম রাজনীতিবিদ ছিলেন।
শেখ কামাল আপনাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন আবাহনীতে খেলতে…
রাম চাঁদ গোয়ালা: আমার ঠিক সালটা মনে নেই। হয়তো ৭৪’র ঘটনা। আঞ্চলিক টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দল এসেছিল ময়মনসিংহে। ওদেরকে আমরা সহজেই হারাই এবং আমি ৬ উইকেট নিয়েছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনায়ক তখন ছিল শেখ কামাল। আমার সঙ্গে সেবারই তার পরিচয় হয়। এরপর সে আরেকবার ময়মনসিংহ আসে। আমাদের পন্ডিতপাড়া ক্লাবে এসে আমাকে আবাহনীতে খেলার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু কামাল আমাকে আবাহনীতে যোগ দিতে দেখে যেতে পারেনি। ৭৮’এ আমি আবাহনীতে যোগ দেই এবং টানা ওখানেই খেলে যাই।
ঢাকা লিগে কিভাবে যুক্ত হলেন। সেই গল্পটা শুনতে চাই?
রামচাঁদ গোয়ালা: আমার প্রথম ক্লাব ভিক্টোরিয়া। ৬২’তে ঢাকা লিগ খেলি। পাঁচ বছর খেলার পর আবার নিজের শহরে ফিরে আসি। এ সময়ে বাবা মারা গেল। আমার ক্রিকেটও আটকে গেল। কিন্তু আবার পাঁচ বছর ফিরে এসে যোগ দেই টাউন ক্লাবে। সেখান এক ম্যাচে ৬ বা ৭ উইকেট নিয়ে আলোচনায় আসি। আমাকে নেয় মোহামেডান। ওদের ওখানে তিন-চার বছর খেলি। ১৯৭৮ সালে যোগ দেই আবাহনীতে। সেখানে কাটাই ১৫ বছর।
ক্যারিয়ারের শেষ তো করেছেন নিজের ঘরের ক্লাবে এসে…
রামচাঁদ গোয়ালা: আবাহনীতে থাকাকালিন আমি অনেক ক্লাবে খেলার অফার পাই। কিন্তু আবাহনীর প্রতি টান ছিল অনেক বেশি। কেন যেন ছাড়তে মন চাইতো না। ওরা আমাকে বছরের পর বছর ক্যারি করতো। ১৯৯৩ সালে ময়মনসিংহ ক্রিকেট ক্লাবে ফেরার কথা চলতে থাকে। আমি তখন নিজেই সিদ্ধান্ত নেই এবার আবাহনী ছাড়ব। ওইতো এভাবেই প্রিয় ক্লাব ছেড়ে আসি। শেষ ৩ বছর এখানেই খেলেছি।
যদি ঢাকা লিগে খেলার সুযোগ হতো তাহলে কোন দলে খেলতেন? আবাহনী নাকি মোহামেডান?
রামচাঁদ গোয়ালা: অবশ্যই আবাহনী। আমার নাম তো আবাহনীর গোয়ালা। মোহামেডানেও খেলেছি। তবে আবাহনীই আমার দল।
আপনি খুব বিনয়ী ছিলেন। কখনো রাগ করতেন না এটা কি সত্যি?
রামচাঁদ গোয়ালা: আমি মাঠে আজ পর্যন্ত কখনো রাগারাগি করিনি। আম্পায়াররা অনেক সময় আমার আবেদনে সাড়া দেয়নি। কিন্তু আমি রাগ হইনি। হাসিমুখে ছিলাম। আমার বল আমি করেছি। নিশ্চয়ই ওই ব্যাটসম্যানকে আবার আউট করেছি। কোনো খেলোয়াড় কিংবা মাঠের বাইরে কারো সাথে রাগারাগি করিনি।
বোলিং পার্টনার হিসেবে ওয়াহিদুল গণি কেমন ছিলেন? আপনাদের স্পিন জুটি তো ভয়ংকর ছিল?
রামচাঁদ গোয়ালা: ওয়াহিদুল গণি তো রাইট আর্ম লেগ স্পিনার ছিল। আমি ছিলাম বাঁহাতি। এখানেই শুধু পার্থক্য। তারও বল ভালো ছিল। তবে বাঁহাতি হিসেবে আমার সুবিধা ছিল বেশি। তার জন্য কাজটা কঠিন ছিল। বল ঘুরিয়ে আর্মার মারা ছিল কঠিন কাজ। অনেক প্র্যাকটিসের দরকার ছিল। সে আবার পারতো।
আপনি তো একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সাকিব বাংলাদেশের সেরা ক্রিকেটার। ও তো এখন বাইরে, ওকে মিস করেন?
রাম চাঁদ গোয়ালা: ও বাইরে কেন? নেয় না…
নাহ স্যার, ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব গোপন রাখছে বলে আইসিসি নিষিদ্ধ করেছে এক বছর…
রাম চাঁদ গোয়ালা: ওতো কিছু তো এখন জানি না। আপনি বললেন দেখে জানলাম।
আপনার চোখে বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত সর্বকালের সেরা একাদশ? (ওয়ানডে)
রামচাঁদ গোয়ালা: আমার এতো খেলোয়াড়ের কথা তো মনে নেই। এখনকার মাশরাফি, সাকিব, ইকবাল (তামিম) থাকত। নান্নু, আকরাম, রফিকও থাকত। আর মনে করে বলতে পারব না।
সর্বকালের সেরা অধিনায়ক?
রামচাঁদ গোয়ালা: ওই মাশরাফি। ও তো ভালো অধিনায়ক।
বিসিবি গত বছর আর্থিক সাহায্য করেছিল। সেটাই কি এখন অবলম্বন?
রামচাঁদ গোয়ালা: হ্যাঁ সেটা দিয়েই এখন চলছি। চোখের চিকিৎসা করালাম। সামনে আবার কি হয় তা তো আর বলতে পারি না। এখন মোটামুটি ভালোই আছি। খাওয়া দাওয়াতে কোনো বাছাবাছি নেই।
ঢাকা/ইয়াসিন/আমিনুল
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/3afe4Pg
0 comments:
Post a Comment