
হারারের গ্যালারি থেকে সিলেটের ২২ গজে
ইয়াসিনদক্ষিণ আফ্রিকা যুব বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের সবথেকে বড় তারকা ছিলেন তিনি। আইসিসি তাকে নিয়ে ভিডিও তৈরি করে লিখেছিল ফিউচার স্টার। জিম্বাবুয়ে প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও তার মধ্যে দেখতে পান দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যত।
প্রতিশ্রুতিশীল ক্রিকেটারকে বিশ্বকাপের পর অপেক্ষা করতে হয়নি। অল্পদিনের ব্যবধানে ঢুকে যান জাতীয় দলের ড্রেসিংরুমে। এখন সেই ড্রেসিংরুমের মধ্যমণি ওয়েসলি মাধভেরে।
সিলেটে বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে জিম্বাবুয়ের প্রাপ্তি মাধভেরের পারফরম্যান্স। বল হাতে তামিমের উইকেট। ব্যাট হাতে দ্যুতি ছড়ানো, দৃঢ়চেতা ৩৫ রানের ইনিংস। অভিষেকে এমন অলরাউন্ড পারফরম্যান্স ইঙ্গিত দিচ্ছে ভালো কিছু অপেক্ষা করছে মাধভেরের।
ক্রিকেটে কিভাবে তার উঠে আসা, ক্রিকেট নিয়ে তার ভাবনা জানার চেষ্টা করেছে রাইজিংবিডি। কথা কথায় উঠে আসে আরও অনেক প্রসঙ্গ। সিলেটের সবুজ গালিচার তার কথা শুনেছে ইয়াসিন হাসান,
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়ে গেল। আপনার ক্রিকেটিং সফর জানতে চাই।
ওয়েসলি মাধভেরে : ধন্যবাদ। আমার সফর অন্যদের মতোই কঠিন ছিল। যদি বলি কঠিনতম ছিল তাহলেও ভুল হবে না। আসলে জীবনে কোনো কিছুই সহজে পাওয়া যায় না। অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত যা হচ্ছে তা সব কিছুই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল। তিনটি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলেছি দেশের হয়ে। এখন ১৯ বছর বয়সেই সুযোগ পেয়েছি জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করার। আমি যে সুযোগগুলো পেয়েছি সেজন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ। পাশাপাশি এ পর্যায়ে আসতে আমাকে যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রত্যেককে আমি স্মরণ করছি। সব মিলিয়ে বলব আমার সফর এখন পর্যন্ত দারুণ কাটছে।
আপনি বললেন আপনার যাত্রা কঠিন ছিল। একটু খুলে বলা যাবে কোন সময়টা সবথেকে কঠিন ছিল?
ওয়েসলি মাধভেরে : নাহ, আমি সাধারণ কষ্টের কথা বলছি। খেলোয়াড় হিসেবে প্রায়ই দেখা যায় আপনার সফল্য থেকে ব্যর্থতার পাল্লা বেশি ভারী হয়। সেটা নিয়েই বলছিলাম। কোনো কিছুই সহজে আসে না। আমি জিম্বাবুয়ের হয়ে খেলব সেই ক্ষুধা সব সময় আমার মধ্যে ছিল। এজন্য আমাকে বাড়তি খাটতে হয়েছে। আবার রানের পর রান করতে হয়েছে। একাধিকবার এমন ঘটনা ঘটেছে, আমি পারফর্ম করতে পারিনি কিন্তু আমাকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সেই সময়টায় যারা আমার পাশে ছিল তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।
ক্রিকেট-ই কেন বেছে নিলেন?
ওয়েসলি মাধভেরে: আমি ক্রিকেট খেলা শুরু করি যখন আমার বয়স মাত্র পাঁচ। এই একটা খেলাই আমি ছোটবেলা থেকে নিয়মিত খেলে আসছি। পাশাপাশি টুকটাক সকারও খেলেছি। কিন্তু ক্রিকেটটাই আমাকে বেশি টানত। এটাকেই আমি ভালোবাসি। যখন সাত হল, লক্ষ্য স্থির করলাম ক্রিকেটার হব। ক্রিকেটের প্রতি আমার যে ভালোবাসা তা কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা চলে না। ভালোবাসা থেকে ক্রিকেটে আসা।
বেশ ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটে খেলা শুরু করেছেন। পরিবার থেকে কেমন সমর্থন পেয়েছেন?
ওয়েসলি মাধভেরে: পরিবার আমার কাছে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাবা-মা, ভাই-বোন আমাকে সব সময় সমর্থন করেছে। বাবা-মা ক্যারিয়ারের জন্য অনেক বিনিয়োগ করেছেন। এখন আমার দায়িত্ব তাদের মুখ উজ্জ্বল করা। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি আমাকে এ পর্যায়ে দেখে তারা নিশ্চয়ই আনন্দিত। এটা আমার জন্যও আনন্দের।
বাবা-মা কি করে?
ওয়েসলি মাধভেরে: আমার মা দক্ষিণ আফ্রিকায় কাজ করে। আমার বাবাও তাই। দুজনই কাজের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকে।
আপনার প্রথম কোচ প্রসপার উতসেয়া বিশ্বাস করেন আপনি জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের ভবিষ্যত। আপনিও কি তা মানেন?
ওয়েসলি মাধভেরে : এটা আমার জন্য সম্মানের। উনার থেকে প্রশংসা পাওয়া অবশ্যই আমার জন্য বড় কিছু। নিজের ওপর আমার বিশ্বাস আছে। পারফরম্যান্স, সামর্থ্য ও প্রতিভায় মাঠের কেউ যদি এমন মন্তব্য করে তখন বেশ ভালো অনুভব হয়। কিন্তু মাঠের মূল কাজটা আমার করতে হবে। মাথা উঠিয়ে নিজের মূল কাজগুলো ঠিকঠাক করে দেশের হয়ে পারফর্ম করতে হবে। যদি করতে পারি অবশ্যই নিজেকে নিয়ে গর্ব করতে পারব।
ক্রিকেটে আপনার আদর্শ কে বা কাকে দেখে মনে হয়েছে আপনি তার মতো হতে চান?
ওয়েসলি মাধভেরে : জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট অনেক ছোটবেলা থেকে অনুসরণ করি। আমি প্রায়ই হারারে স্পোর্টস গ্রাউন্ডে যেতাম। সেখানে হ্যামি (হ্যামিলটন মাসাকাদজা), এল্টন চিগাম্বুরা, ব্রেন্ডন টেলরকে দেখে বড় হয়েছি। তাদের খেলা আমি গ্যালারি থেকে দেখেছি। শুধু জাতীয় দলের খেলার সময়ই নয় ঘরোয়া ক্রিকেটের খেলাও আমি দেখতে যেতাম। যদি দেশের বাইরের কারো কথা বলতে হয়, তাহলে দুজন মানুষের কথা বলব- প্রথমজন বিরাট কোহলি। দ্বিতীয়জন এবি ডি ভিলিয়ার্স। তারা আমার খুব পছন্দের। তবে আমার আদর্শ জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটাররাই।
এখন অনেকের সাথেই ড্রেসিং রুম ভাগাভাগি করছেন। টেলর এখনও খেলছেন। মাসাকাদজা আপনাদের ক্রিকেট পরিচালক…
ওয়েসলি মাধভেরে: এটা ভাবতে ভালো লাগে যাদেরকে দেখে বড় হয়েছি এখন তাদের সঙ্গে এক ড্রেসিং রুম ভাগাভাগি করছি। এরকম সুযোগ সব সময় পাওয়া যায় না। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি এ কারণেই। তারা জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটকে দীর্ঘদিন প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আমাদের দেশের বড় তারকা। এটা আমার জন্য স্বপ্নের থেকেও বড় কিছু আমি বলব। হয়তো এরকম স্বপ্নের কথা কখনো ভাবিনি। আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া।
বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজটি আপনার জন্য কতোটা গুরুত্বপূর্ণ?
ওয়েসলি মাধভেরে: এমন কিছু করার চেষ্টা থাকবে যেন আমার দেশ, আমার দল জয়ের মুখ দেখতে পারে। এ সিরিজে যে ফল আসবে তা আমি সাদরে গ্রহণ করব। কারণ এটা আমার জন্য অনেকটা শিক্ষা সফর।
জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট একজন তরুণ ক্রিকেটারের জন্য বেড়ে উঠা কতোটা কঠিন?
ওয়েসলি মাধভেরে: আমি বলব না খুব কঠিন। তবে সহজেই কোনো কিছু আসে না। প্রত্যেকটি পর্যায়ে আপনি কঠিন পথ পাবেন সেখান থেকে বের হওয়ার পথও আছে। আপনি যদি সত্যিই ক্রিকেটার হতে চান তাহলে আপনি জানবেন কিভাবে আপনি সফল হবেন। সেই কাজগুলো করলে আপনি সঠিক পথে থাকবেন।
আরেকটি বিষয় পরিবার। আপনার পরিবার যদি আপনাকে সমর্থন করে তাহলে কাজটা সহজ হয়। কারণ জিম্বাবুয়েতে ক্রিকেট ব্যয়বহুল। আপনি যদি শৈশবেই বুঝে যান জীবনে সফল হতে হলে কষ্ট করতে হবে তাহলে আপনি যত বড় হতে থাকবেন তত আরও পরিণত হবেন। আপনার ভেতরে ভালো করার তাড়ণা আরো বেড়ে যাবে।
সাথে যোগ করতে চাই, যখন আপনি সুযোগগুলো ভালোভাবে কাজে লাগাবেন তখন আপনাআপনি পরবর্তী দরজা খুলে যাবে। শুরুতে কষ্ট করতে হবে। কিন্তু যখন পারফর্ম করতে থাকবেন তখন সব পথ খুলে যাবে।
আপনার প্রথম ক্লাব বা একাডেমি কোনটা ছিল?
ওয়েসলি মাধভেরে: আমার প্রথম একাডেমি ছিল গ্ল্যাডিয়েটর। হারারে স্পোর্টস গ্রাউন্ডের ঠিক পাশেই একাডেমিটি। ওখানে অনেক ক্রিকেটার বেড়ে উঠেছে। এখনও নিয়মিত ক্রিকেট চর্চা হয় সেখানে। ওদের দলটাও বেশ ভালো।
যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আপনাদের সাথেই প্রথম ম্যাচ হয়েছিল। তখন কি দেখে মনে হয়েছিল বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হতে পারবে?
ওয়েসলি মাধভেরে: মোটেও অবাক হইনি, বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আমাদের বিপক্ষে যেভাবে খেলেছে তখনই মনে হয়েছে দলটা অনেকদূর যাবে। প্রতিভাবান অনেক খেলোয়াড় ছিল যাদের জয়ের ক্ষুধা অনেক বেশি। চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সেটা প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু অবাক হয়েছি যেটা দেখে…ফাইনালে ভারতকে হারানো। ভারত টুর্নামেন্টে ফেভারিট দল ছিল। তাদের বিপক্ষে ফাইনাল জেতা ছিল কঠিন। তারা যেই কাজটা করেছে সেটা খেলোয়াড় হিসেবে শিক্ষণীয়।
সিলেট/ইয়াসিন/আমিনুল
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/2VAYA3j
0 comments:
Post a Comment