
করোনায় ব্যস্ত প্রশাসন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় কতটুকু প্রস্তুত?
মোহাম্মদ নঈমুদ্দীনচলতি এপ্রিল মাসের শুরু থেকে নভেল করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে কঠিন পরিস্থিতি পার করছে দেশ। এই মহামাবি রাজধানী ছাড়িয়ে আস্তে আস্তে জেলা-উপজেলায় পৌঁছে গেছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণরোধে চতুর্থদফা সাধারণ ছুটি দিয়ে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে দেশের মানুষকে বাসা-বাড়িতে ধরে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।
এপ্রিল মাসের দিন যতই যাচ্ছে, ততই বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। দেশের উপকূলে মূলতঃ বর্ষাকালের শুরুতে এপ্রিল-মে মাসে এবং বর্ষার শেষে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ দেখা দেয়।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়, এদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি, বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
করোনার এই বিপদমুহূর্তে আবহাওয়ার পরিবেশ পরিস্থিতি ঘন ঘন পরিবর্তন হচ্ছে। যে কোনো সময় ধেয়ে আসতে পারে ঘূর্ণিঝড়ের মতো আরেকটি দুর্যোগ। কিন্তু মাঠ প্রশাসন এখন করোনার পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যস্ত সময় পার করছে। করোনা এই মহাদুর্যোগের সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ হলে উপকূলীয় এলাকার জনগণকে বড় ধরনের বিপদে পড়তে হতে পারে। তাই এখনই প্রস্তুতি নেওয়া দরকার বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাঠ পর্যায়ের এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, সবাই এখন করোনা মহাদুর্যোগ নিয়ে ব্যস্ত। এটা ঠিক, যে কোনো সময় ঘূর্ণিঝড় হানা দিতে পারে। তাই সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখন থেকে প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এখন থেকে যথেষ্ট প্রস্তুতি না থাকলে করোনার এ সময়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় এলাকার মানুষদের সাইক্লোন সেন্টারে নিরাপদে রাখা কঠিন হবে। এমনিতে করোনার সংক্রমণরোধে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে জনগণকে বাসা বাড়িতে আবদ্ধ রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়টি মাথায় রেখে সাইক্লোন সেন্টার ঠিক করে রাখাসহ যাবতীয় প্রস্তুতি না থাকলে তখন আরো সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
তবে সরকার বলছে, করোনা ভাইরাসের এ সময়ে ঘূর্ণিঝড় হলে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে জনগণকে নিরাপদে রাখার সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে। কারণ ঘূর্ণিঝড় করোনার মতো পূর্বাভাস ছাড়া আসবে না। হাতে যে সময় পাওয়া যাবে, তাতেই হয়ে যাবে।
করোনা ভাইরাসের এ সময়ে ঘূর্ণিঝড় হলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সাইক্লোন সেন্টারে জনগণকে নিরাপদের রাখার প্রস্তুতি রয়েছে কিনা, সরকারিভাবে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আছে কিনা জানতে চাইলে উপকূলীয় জেলা রাঙামাটির জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশিদ রাইজিংবিডিকে বলেন, যে কোনো দুর্যোগের বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছেন, তাদের প্রস্তুতিও রয়েছে। অসুস্থতার কারণে কয়েক দিন তার মেইল দেখার সুযোগ হয়নি। সরকারিভাবে এই ধরনের নির্দেশনা আসছে কিনা এ মুহূর্তে বলতে পারছেন না।
নির্দেশনা আসুক আর নাই আসুক, ঘূর্ণিঝড়সহ যে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় তাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে। এটা রুটিনওয়ার্ক। যখন সমস্যা, তখনই সমাধান করতে পারবেন বলে জানান তিনি।
করোনা মহাদুর্যোগের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় হলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে তা মোকাবেলায় সরকারের পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে। দেশের ৪ হাজার ঘুর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আরো দুই শতাধিক অত্যাধুনিক ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। তারমধ্যে অনেক আশ্রয়কেন্দ্রের কাজ শেষ হয়েছে।
প্রস্তুতির কথা জানিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মোহসীন বলেন, তারা সব সময় প্রস্তুত থাকেন। করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময় ঘূর্ণিঝড় হলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই মানুষদের আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হবে। এক্ষেত্রে আগে যেখানে বেশি মানুষ রাখা হতো, এখন সেখানে কম মানুষ রাখা হবে।
তিনি বলেন, সাধারণত এপ্রিল-মে মাস থেকে ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ দেখা যায়। সেটা মাথায় রেখে সবধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। কোনো সমস্যা হবে না। করোনার কারণে এমনিতেই স্কুল কলেজ বন্ধ আছে। সাইক্লোন সেন্টারগুলো তো আছেই। প্রয়োজনে দেশের যে কোনো প্রতিষ্ঠান আপদকালীন সময়ে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
বিভাগীয় পর্যায়ে সরকারের প্রস্তুতি জানতে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার এ বি এম আজাদ বলেন, ‘‘আমরা সবাই এখন করোনা মহাদুর্যোগ মোকাবেলায় আছি। তারপরও আমার জানামতে ঘূর্ণিঝড় কিংবা দুর্যোগের ব্যাপারে স্ট্যান্ডিং অর্ডার সবসময় থাকে। ডিসিসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে সেটা আগে থেকেই দেওয়া থাকে।’’
তিনি বলেন, ‘‘অন্যসময় হলে হয়তো এখন থেকে ঘূর্ণিঝড় কিংবা যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হতো। হয়তো করোনাভাইরাসের কারণে সেটা এখন ওই রেঞ্জে নেই। করোনা নিয়ে আমরা বেশি এলার্ড, তাই বলে অন্যসব প্রস্তুতি বন্ধ তা কিন্তু না। দুর্যোগ তো নানান ধরণের আছে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়।
‘‘আমি মনে করি, করোনার এই সময়েও ঘুর্ণিঝড় হোক কিংবা দুর্যোগ, ছোট-বড় যেটাই হোক, প্রস্তুতি থাকা দরকার। এ ধরনের কিছু হলে সবাইকে নিয়ে মাঠে নামতে হবে।’’
সরকারেরও নানা প্রস্তুতির দরকার রয়েছে বলে মনে করেন সরকারের এই শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তা।
এ বি এম আজাদ বলেন, এই মুহূর্তে দুর্যোগ হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে করোনাভাইরাস। অদৃশ্য প্রাণঘাতী এক মহাদুর্যোগ। বাকি দুর্যোগগুলোর সঙ্গে দেশের মানুষ পরিচিত। ওটা আসামাত্রই একটা প্রস্তুতি নিতে পারা যাবে; এরকম মানসিক শক্তি সকলের আছে।
ঝড় আসার ১০ দিন আগে পূর্বাভাস দেয়। চাইলে এই ১০ দিনের মধ্যে সবধরনের প্রস্তুতি নেওয়া যাবে বলে জানান তিনি।
করোনাভাইরাসের বিপদের এই সময়ে ঘূর্ণিঝড় না হোক- এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল বলেন, ‘‘আল্লাহর রহমতে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। আশা করছি এ সময়ে ঘূর্ণিঝড় হবে না। যদি এমন কিছু হয়, তার জন্য আমাদের পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত এ ধরনের কোনো সিগন্যাল নেই।’’
ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ দেখা গেলে পাঁচ আগ থেকে সতর্কতামূলক প্রস্তুতি শুরু করে দেবেন বলে জানান তিনি।
সচিব বলেন, ভয়ের কারণ নেই, ঘূর্ণিঝড় হলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জনগণকে নিরাপদে রাখতে যা কিছু করা দরকার, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
‘‘তবে আমি মনে করি, কঠিন এ সময়ে আল্লাহ ঘূর্ণিঝড় দেবেন না। আমরা সবাই প্রার্থনা করি, যেন এ কঠিন সময়ে অন্য কোনো দুর্যোগ না দেন।’’
২০১৯ সালের ১০ নভেম্বর সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় বুলবুল সাতক্ষীরা ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানে। এতে দুইজন নিহত ও ৩০ জন আহত হয় এবং ৫ হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণপ্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান।
ঢাকা/বকুল
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/34Thvt7
0 comments:
Post a Comment