
বড় লোকসানের মুখে হজ এজেন্সি, প্রনোদনা চায় হাব
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদককরোনা ভাইরাসের কারণে ওমরা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং হজ পালন নিয়ে অনিশ্চিয়তার মধ্যে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে ওমরা ও হজ এজেন্সিগুলো। অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাওয়ায় ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাদের।
এই ব্যবসার সাথে জড়িত এজেন্সি মালিকসহ বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা, কর্মচারীর জীবন-জীবিকা সঙ্কটের মুখে পড়েছে।
ওমরা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুরু থেকেই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে এজেন্সিগুলো। করোনার কারণে নগদ অর্থ খরচ করেও ওমরা যাত্রীদের সৌদি আরব পাঠাতে পারেনি। হজযাত্রীও কমে গেছে। ফলে দিন দিন এজেন্সিগুলোর অবস্থা শোচনীয় হচ্ছে।
করোনার কারণে যদি এবছর হজ বাতিল হয়ে যায়, তাহলে পুরো বছরের ব্যবসা লাটে উঠবে এজেন্সিগুলোর। ওমরা ও হজ মিলিয়ে এজেন্সিগুলোর ছয় হাজার ১২৫ কোটি টাকা লোকসান হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হজ এজেন্সি মালিক দুঃখ করে বলেন, ‘ওমরা ও হজ ব্যবসা করে আমরা পরিবার চালাই। এর আয় দিয়ে সারাবছরের জীবন জীবিকা নির্বাহ হয়। ওমরা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং হজ কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন দিতে পারছি না। অফিস ভাড়াও বাকি পড়েছে। জানি না কি হবে, হজ না হলে আমরা তো মাঠে মারা যাব।’
বাংলাদেশ হজযাত্রী ও হাজি কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ড. আব্দুল্লাহ আল নাসের জানান, এজেন্সিগুলোর অবস্থা শোচনীয়। হজ না হলে না খেয়ে থাকতে হবে। হজ ও ওমরা এজেন্সিসহ এর সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারকে বাঁচাতে হলে আর্থিক প্রনোদনা দিতে হবে সরকারকে। হজের কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ হজ এজেন্সি লোকসানের মুখে পড়ে কর্মচারীদের বেতন এবং অফিস ভাড়া দিতে পারছে না বলেও জানান তিনি।
এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ওমরা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং হজ কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছে হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)। আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হাবের পক্ষ থেকে সম্প্রতি সরকারের কাছে বিশেষ অর্থনৈতিক প্রণোদনা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) অর্থমন্ত্রী বরাবরে দেওয়া হাবের চিঠিতে হজ ও ওমরাহ এজেন্সিগুলোর লোকসান পূরণের জন্য নগদ প্রণোদনা প্রদান, তাদের জন্য এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা সুদমুক্ত ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণের ব্যবস্থা করা, ট্রাভেল এজেন্ট ও ট্যুর অপারেটদের জন্য প্রয়োজনীয় নগদ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা এবং প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ-১ এর আওতায় ট্রাভেল এজেন্ট ট্যুর অপারেটরদের জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণসহ চার দফা দাবি রয়েছে।
চিঠিতে এজেন্সিগুলোর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সৌদি সরকার ওমরাহ বন্ধ ঘোষণার পর ১০ হাজার ওমরাহ যাত্রীর ভিসা, এয়ার টিকিটের মূল্য বাবদ ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছিল। এছাড়াও আসন্ন রমজান মাসে ওমরাহ হজে গমনকারীদের জন্য আরো ২৫ কোটি টাকা মূল্যের পাঁচ হাজার এয়ার টিকিট অগ্রিম কেনা হয়। এছাড়া কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মার্চ মাসের বেতন ও অন্যান্য অফিস খরচসহ প্রায় ৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। এ বাবদ লোকসানের পরিমাণ ১৭৫ কোটি টাকা।
চিঠিতে আরও বলা হয়, আগামী রমজান পর্যন্ত কমপক্ষে আরও এক লাখ ওমরাহ যাত্রীর ওমরাহ করানোর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। এক্ষেত্রে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা লেনদেন হতো। এছাড়াও এবছর বেসরকারিভাবে এক লাখ ২০ হাজার হজযাত্রী পবিত্র হজ পালনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। যদি কোনো কারণে চলতি বছর তারা হজে যেতে না পারেন তাহলে এ বাবদ ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষতির পরিমাণ হবে চার হাজার ৮০০ কোটি টাকা। লোকসান পূরণের কোনো সম্ভাবনা থাকবে না।
তাছাড়া এ অর্থবছরের শেষ অর্থাৎ আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত হজ ও ওমরা হজ এজেন্সিসমূহের ওভারহেড খরচ যেমন অফিস ভাড়া ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতাদি মাসিক প্রায় ৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। ফলে অসংখ্য এজেন্সি সারা বছরের অফিস ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করার সক্ষমতা হারাবে।
করেনাভাইরাসের কারণে এ সেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হলে আগামীতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ১০ হাজার কর্মচারী এবং বাংলাদেশ ও সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিসহ পরোক্ষভাবে জড়িত ৫০ হাজার ব্যক্তির চাকরি হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর কাছে দেয়াও চিঠিতে চার দফা প্রণোদনা প্রস্তাবের শেষে হাব সদস্য, হজ, ওমরাহ ও ট্রাভেল এজেন্সির অপারেটরসহ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এবং এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় এক লাখ ২০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক সুবিধা প্রদানের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
হাব সভাপতি এম শাহাদাত হোসেন তসলিম বলেন, ‘‘বাংলাদেশের মোট হজযাত্রীর ৯৬ শতাংশ এবং ওমরাহ যাত্রীর শতভাগ কার্যক্রম হাব সদস্য হজ ও ওমরা এজেন্সির প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। হাবের সদস্যরা ট্রাভেল ও ট্যুর অপারেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফলে করোনাভাইরাসের প্রভাবে তারা বিপুল অঙ্কের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। সরকারের আর্থিক প্রনোদনা ছাড়া যেটা পুরণ করা তাদের পক্ষে কখনই সম্ভব নয়।
‘এ কারণে এজেন্সি ও এর সঙ্গে জড়িতদের লোকসান পুষিয়ে নিতে, তাদের বাঁচানোর স্বার্থে আর্থিক প্রনোদনাসহ চারটি ন্যয্য দাবি তুলে ধরে সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছি। আশা করছি বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে হাবের সদস্য সংখ্যা এক হাজার ২৩৮ জন। হজ এজেন্সিগুলোর মালিকসহ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাসিক বেতন এবং অফিস ভাড়া ও অন্যান্য খরচসহ মাসে প্রায় ৫০ কোটি টাকা খরচ হয়। এছাড়া এ পেশার সঙ্গে পরোক্ষভাবে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবে আরও প্রায় এক লাখ লোক নিয়োজিত আছে। এ অবস্থায় বিশাল লোকসানের মুখে পড়েছে আমাদের সদস্য এজেন্সিগুলো।’
প্রসঙ্গত, করোনার ভাইরাসের কারণে ২৬ ফেব্রুয়ারি ওমরাহ বন্ধ ঘোষণা করে সৌদি সরকার। সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনও করোনার সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় আসন্ন পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হবে কি না এ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
ঢাকা/নঈমুদ্দীন/সনি
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/3b2WgqW
0 comments:
Post a Comment