
ত্রাণ লুট : কঠোর অবস্থানে গেল আ.লীগ
এসকে রেজা পারভেজকরোনাভাইরাসের কারণে খাদ্য সংকটে থাকা মানুষের জন্য ত্রাণ বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এসব ত্রাণ হাতিয়ে নেওয়া কিছু দলীয় নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। অভিযোগ প্রমাণ হওয়া সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নিচ্ছে দলটি।
মঙ্গলবার ত্রাণ আত্মসাতের অভিযোগে মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন ইউনিটের পদধারী বেশ কয়েকজন নেতার ভাগ্যে জুটেছে সাংগঠনিক শাস্তি। সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ দেওয়া চাল চুরির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদেরকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তদন্তাধীন আছে আরো কিছু ঘটনা।
এর মাধ্যমে দল লুটেরাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন।
তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘এই দুর্ভোগে যারা এ ধরনের অমানবিক আচরণ করতে পারে তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। এরা আওয়ামী লীগের আদর্শের পরিপন্থী। এদের থেকে দলকে মুক্ত করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে, মানুষের এই দুর্ভোগের সময় যারা দুর্নীতি করবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
ত্রাণের চাল চুরি দায়ে এরইমধ্যে বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান আনিস, নন্দীগ্রাম সদর ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আনসার আলী, সারিয়াকান্দি উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি গাজিউল হক গাজী এবং শিবগঞ্জের সৈয়দপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সাজুকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান মজনু ও সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপু চারজনকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।
এছাড়া, নাটোরের সিংড়ায় চাল চুরির দায়ে দুই আওয়ামী লীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এরা হচ্ছেন সুকাশ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহিন শাহ এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক আব্দুল আওয়াল স্বপন। সুকাশ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আজাহার আলী ও সাধারণ সম্পাদক হালিম মো. হাসমত বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ত্রাণের চাল চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া পাবনার ঢালারচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি কোরবান আলী সরদারকে আজীবনের জন্য আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও পাবনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রেজাউল রহিম লাল ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক প্রিন্স এমপি মঙ্গলবার দুপুরে এ খবর নিশ্চিত করেছেন। তারা জানিয়েছেন, রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেনের নির্দেশে ত্রাণের চাল চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া পাবনার ঢালারচর ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি কোরবান আলী সরদারকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পদ থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ১০ টাকা কেজির সরকারি চাল বিক্রিতে ওজনে কম দেওয়ায় হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার কাগাপাশা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম খানকে বহিষ্কার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। এর আগে ওজনে চাল কম দেওয়ার বিষয়টি হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে চালের ডিলার নজরুল ইসলামকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি তার ডিলারশিপ বাতিল করা হয়।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আমির হোসেন মাস্টার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, দেশের দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে দরিদ্র মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো সরকারি চাল ওজনে কম দিয়েছেন নজরুল ইসলাম খান। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। তার অনিয়মের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
গত কয়েক দিনে ত্রাণ লুণ্ঠনের অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে। একদিকে দলের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী ত্রাণ নিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়ানোয় প্রশংসা পাচ্ছেন আওয়ামী লীগের নেতারা, অন্যদিকে ত্রাণ লুণ্ঠনের বেশকিছু ঘটনা বিব্রত করেছে দলটিকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নেতারা রাইজিংবিডিকে জানিয়েছিলেন, ত্রাণ লুটে দলের জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলাসহ তিন ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব ব্যবস্থা হলো- ত্রাণ লুটের সঙ্গে জড়িতদের দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হবে। ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাবেন না তারা। একই সঙ্গে ফৌজদারি মামলা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবশেষে ত্রাণ আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে গেলো আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের খুলনা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘ত্রাণ নিয়ে যারা অনিয়ম করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। এদের কোনো দল নেই, এদের কোনো নীতি নেই। এরা দেশের শত্রু। ত্রাণ আত্মসাৎকারীদের শুধু দল থেকে বহিষ্কার নয়, তাদেরকে ইতোমধ্যেই আইনের আওতায়ও আনা হচ্ছে।’
এ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশে ইউনিয়ন, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে ২০ জন করে সদস্য থাকে। এভাবে যদি আমরা হিসাব করি দেশে ৭২ হাজারের বেশি স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি আছেন। সে ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ৪৫টি মামলা হয়েছে অর্থাৎ প্রায় ২ হাজারের মধ্যে একটি ঘটনা। তবে একটি ঘটনাও কাম্য নয়। প্রধানমন্ত্রী এজন্য ঘোষণা করেছেন, যারা এ ধরনের অপরাধে যুক্ত হবে, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাদের বিচার হবে। এরপর রেগুলার মামলা মাধ্যমেও বিচার হবে।’
সরকার এই ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ত্রাণ নিয়ে অনিয়মের বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। এখানে সবগুলো ঘটনা প্রমাণিত নয়। এ পর্যন্ত ছয়টি ঘটনা প্রমাণিত। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে একজন চেয়ারম্যান, দুজন মেম্বারকে বরখাস্ত করেছে। অর্থাৎ সরকার এই ব্যাপারে এ ধরনের অনিয়মকে বন্ধ করতে বদ্ধ পরিকর।’
ঢাকা/পারভেজ/রফিক
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/3eg3B8q
0 comments:
Post a Comment